ইউরোপীয় মিশনারী ও বাংলা গদ্য

ইউরোপীয় মিশনারী ও বাংলা গদ্য

বাংলা গদ্যের ইতিহাসে ইউরোপীয় মিশনারীদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মধ্যযুগীয় বাংলা সাহিত্য মূলত কাব্যকেন্দ্রিক ছিল, গদ্যের বিকাশ তখনও সীমিত। ষোড়শ-অষ্টাদশ শতাব্দীতে ইউরোপীয় মিশনারীদের আগমন এই পরিস্থিতিতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটায়। খ্রিস্টধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্যে তারা বাংলা ভাষা শিখে নেন, ধর্মগ্রন্থ অনুবাদ করেন এবং মুদ্রণযন্ত্রের সাহায্যে গদ্যরচনা প্রকাশ করেন। এতে বাংলা গদ্যের প্রথম আনুষ্ঠানিক রূপ গঠিত হয়, যা পরবর্তীকালে আধুনিক বাংলা সাহিত্যের ভিত্তি স্থাপন করে। এই লেখায় আমরা পোর্তুগিজ ও ইংরেজ মিশনারীদের অবদান নিয়ে আলোচনা করব।

পোর্তুগিজ মিশনারীদের অগ্রদূত ভূমিকা

পোর্তুগিজ মিশনারীরা বাংলায় প্রথম আসেন ষোড়শ শতাব্দীতে। তারা খ্রিস্টধর্ম প্রচারের জন্য বাংলা ভাষায় দক্ষতা অর্জন করেন এবং গদ্যরচনায় হাত দেয়। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন ঢাকার ভাওয়াল অঞ্চলকে কেন্দ্র করে কাজকারবারী পাদ্রিরা। এই অঞ্চল তখন তাদের প্রধান প্রচারকেন্দ্র ছিল।

সপ্তদশ শতাব্দীর শেষভাগে লিখিত “ব্রাহ্মণ-রোমান ক্যাথলিক-সংবাদ” বাংলা গদ্যের প্রথম নিদর্শনগুলির একটি। এর রচয়িতা দোম আন্তোনিও, যিনি একজন বাঙালি জমিদারপুত্র ছিলেন। মুসলিম শাসকদের দ্বারা অপহৃত হয়ে পোর্তুগিজ পাদ্রিরা তাঁকে কিনে খ্রিস্টধর্মে দীক্ষিত করেন। ধর্মান্তরণের পর তিনি খ্রিস্টধর্মের মাহাত্ম্য বর্ণনা করে এই গ্রন্থ রচনা করেন। গ্রন্থটি মিশনারী-প্রবর্তিত বাংলা গদ্যের বিশ্বস্ত নিদর্শন। এতে পারসিক শব্দের ব্যবহার এবং পোর্তুগিজ ভাষার ছাপ লক্ষণীয়, যা তৎকালীন বাংলা গদ্যের মিশ্রিত রূপকে প্রতিফলিত করে।

অষ্টাদশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে ম্যানুয়েল দ্য আসুম্পসাও-র “কপোর শাস্ত্রের অর্থভেদ” প্রকাশিত হয়। এটি গুরু-শিষ্যের প্রশ্নোত্তর আকারে রোমান ক্যাথলিক ধর্মের তত্ত্ব ও অনুষ্ঠান আলোচনা করে। ১৭৭৩ সালে লিসবনে রোমান হরফে মুদ্রিত এই গ্রন্থটি ভাওয়ালের উপভাষার ছাপ বহন করে। লেখকের মাতৃভাষা (পোর্তুগিজ) এবং স্থানীয় উপভাষার মিশ্রণে গদ্যটি কখনো কখনো জটিল হলেও, এর ধর্মপ্রচারমূলক উদ্দেশ্য স্পষ্ট। উদাহরণস্বরূপ, গ্রন্থের একটি অংশে বর্ণিত: “সিদ্ধা পালাধিও বনের ঠমধে বসত করিতেন। সেই বনের নজদিক এক শহর আছিল। সেই শহরে অনেক বেপারি বেপার করিত।” এই ধরনের সরল বর্ণনা তৎকালীন গদ্যের আদিম রূপ দেখায়।

পোর্তুগিজ মিশনারীদের অধ্যবসায় বিস্ময়কর। তারা বাংলা ব্যাকরণ রচনা করেন, বাংলা-পোর্তুগিজ অভিধান সংকলন করেন। এতে বিদেশি ভাষার অনুশীলনে তাদের নিষ্ঠা প্রকাশ পায়, যা বাংলা গদ্যের ভিত্তি মজবুত করে।

ইংরেজ মিশনারীদের বিপ্লবী অবদান

অষ্টাদশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে ইংরেজ প্রভুত্ব প্রতিষ্ঠার সঙ্গে ইংরেজ মিশনারীরা বাংলায় প্রবেশ করেন। ১৮০০ সালে কলকাতার নিকট শ্রীরামপুরে সেরামপুর মিশন স্থাপিত হয়, যা তখন ডেনিশ অধীনে ছিল। উইলিয়াম কেরি, জোসেফ মার্শম্যান ও জোর্জ উইলিয়াম ওয়ার্ড এই মিশনের প্রধান উদ্যোক্তা। ধর্মপ্রচারের পাশাপাশি তারা বাংলা ভাষার উন্নয়নে মনোনিবেশ করেন।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান ছিল মুদ্রণযন্ত্রের প্রবর্তন। ১৭৭৮ সালে চার্লস উইলকিন্স বাংলা অক্ষর উদ্ভাবন করেন এবং হুগলিতে প্রথম ছাপাখানা স্থাপন করেন। এখান থেকে ন্যাথানিয়েল ব্রায়ান হালহেডের “A Grammar of the Bengal Language” মুদ্রিত হয়—যদিও ইংরেজিতে লিখিত, এতে রামায়ণ-মহাভারত থেকে বাংলা দৃষ্টান্ত সংকলিত। এটি বাংলা অক্ষরে প্রথম মুদ্রিত গ্রন্থ। পরবর্তীকালে দেওয়ানী-ফৌজদারী আইনের অনুবাদ এবং ফরাস্টারের “Criminal Code” এর অনুবাদ মুদ্রিত হয় (১৭৮৫-১৭৯৯)।

শ্রীরামপুর মিশন প্রেস (Serampore Mission Press) বাংলা গদ্যের সোনালী অধ্যায়। পঞ্চানন কর্মকারের সাহায্যে এখানে বাইবেলের বাংলা অনুবাদ “সক্রেয় ধর্মের পবিত্র সুসমাচার” (১৮০০ থেকে) মুদ্রিত হয়। কয়েক বছরের মধ্যে অসংখ্য গদ্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়, যার মধ্যে কৃত্তিবাসী রামায়ণ ও কাশীরাম দাসের মহাভারতের প্রথম মুদ্রণ উল্লেখযোগ্য। এছাড়া বাংলা ব্যাকরণ, বাংলা-ইংরেজি অভিধান এবং প্রথম বাংলা সংবাদপত্রও এদের হাতে গড়ে ওঠে।

ইংরেজ মিশনারীরা বাংলা গদ্যকে শুধু ধর্মপ্রচারের হাতিয়ার করেননি, তার প্রসারে বিপুল ভূমিকা রাখেন। অসাড় গদ্যকে প্রাণবন্ত করার মতো কাজ তাদের—যদিও খ্রিস্টান মতবাদের ছাপ ছিল, তবু এতে বাংলা সাহিত্যের আত্মবিকাশের প্রেরণা জাগে।

ইউরোপীয় মিশনারীরা বাংলা গদ্যের পথিকৃৎ। পোর্তুগিজরা আদিম গদ্যের ভিত্তি গড়েন, ইংরেজরা মুদ্রণের মাধ্যমে তা প্রসারিত করেন। ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের সঙ্গে মিলে এদের কাজ আধুনিক বাংলা গদ্যের যুগ উদ্বোধন করে। রামমোহন রায়ের মতো সংস্কারকরা পরে এই ভিত্তিতে নতুন গদ্যশৈলী গড়েন। তাদের অধ্যবসায় ছাড়া বাংলা গদ্যের এত দ্রুত বিকাশ অসম্ভব ছিল। এই অধ্যায় বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে চিরস্মরণীয়।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *