কবিগান-পাঁচালি-টপ্লা-যাত্রা: সন্ধিপর্বের লোকসাহিত্যের জনপ্রিয় ধারা

কবিগান-পাঁচালি-টপ্লা-যাত্রা: সন্ধিপর্বের লোকসাহিত্যের জনপ্রিয় ধারা

বাংলা সাহিত্যের সন্ধিপর্ব (অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষভাগ থেকে উনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধ)—যাকে ‘পুরাতনের অন্থবতন ও কাব্যভাবনায় নতুনের পদসঞ্চার’ বলে চিহ্নিত করা হয়—এই যুগে বাঙালির সাংস্কৃতিক জীবনে এক বিশেষ রূপান্তর ঘটে। ইংরেজ-শাসনের প্রভাবে শহুরে সমাজের উত্থান ঘটলেও গ্রামীণ ও আপামর জনগোষ্ঠীর মধ্যে লোকসাহিত্যের ধারা অটুট ছিল। এই পর্বে কবিগান, পাঁচালি, টপ্লা এবং যাত্রা—এই চারটি লোকধারাই জনপ্রিয়তার শিখরে পৌঁছায়। এগুলি শুধু বিনোদনের মাধ্যম নয়, সমাজের আবেগ, ধর্মীয় ভাবনা এবং দৈনন্দিন জীবনের প্রতিফলনের ক্ষেত্রও। এই রচনায় এই ধারাগুলির ঐতিহাসিক পটভূমি, বৈশিষ্ট্য এবং প্রধান রচয়িতাদের আলোচনা করব।

কবিগান: লোকসাধারণের গানের আসর

বাংলা গানের দেশে কবিগানকে ‘কবির লড়াই’ বলে পরিচিত ছিল। অষ্টাদশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধ থেকে উনবিংশ শতাব্দীর প্রথম পাদ পর্যন্ত এটি আপামর জনসাধারণের মধ্যে প্রবল উত্তেজনা সৃষ্টি করে। কবিওয়ালা (কবি-গায়ক) নামে পরিচিত এই শিল্পীরা দুই দলে বিভক্ত হয়ে আসরে বসে গানের মাধ্যমে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতেন। এটি ছিল ছন্দোবদ্ধ বাক্যুদ্ধ—প্রশংসা, বিদ্রূপ এবং ধর্মীয় আলোচনার মিশ্রণ। রবীন্দ্রনাথের ভাষায়, এটি ছিল ‘হঠাৎ-রাজার সভায় উপযুক্ত গান’—শহুরে বণিকশ্রেণীর আমোদের জন্য উদ্ভূত।

কবিগানের তিনটি যুগ:

  • গঠনযুগ (১৭৬০-১৮০০): গৌরলল গুইকে আদি। বিষয় ছিল রাধা-কৃষ্ণের লীলা, বৈষ্ণব পদাবলীর অনুকরণ।
  • ঐশ্বর্যযুগ (১৮০০-১৮৩০): খ্যাতনামা কবিরা যেমন রামবস্তু, হরু ঠাকুর, ভোলা ময়রা, আন্টনি ফিরিঙ্গি। এখানে বিষয়বৈচিত্র্য বাড়ে—বিরহ, সখীসংবাদ, আগমনী-গান।
  • অস্তযুগ: ইংরেজি শিক্ষা ও নব্যকাব্যের উত্থানে এর পতন ঘটে।

কবিগানের গঠন: চিতান, পরচিতান, ফুকা, মেলা, মহড়া, সওয়ারি, খাঁড়ি ইত্যাদি অংশ। ছন্দে বৈষ্ণবপদের প্রভাব, কিন্তু অনুপ্রাসের অত্যধিক প্রয়োগে কখনো হাস্যকর হয়। রামবস্তুর গান যেমন—”রাধা দাড়াও গণনাথ বদন ঢেকে যেও না”—সরল অনুরাগের স্পর্শময়। হরু ঠাকুরের বিরহ-বর্ণনা মধুর, ভোলা ময়রার “বধূর বাঁশি বাজে বিপিনে” শ্রুতিমধুর। আন্টনি ফিরিঙ্গির গানে হাস্যরস ও ধর্মীয় বিতর্ক মিশ্রিত, যেমন খ্রিস্টান-হিন্দু লড়াইয়ের উদাহরণ।

কবিগান লোকরঞ্জনমূলক হলেও, এতে ভাবের গভীরতা কম। তবে সহজ ভাষায় জনমন স্পর্শ করেছে, যা আধুনিক কাব্যের সাথে তুলনীয় নয়।

পাঁচালি: নৃত্য-গীত-আবৃত্তির মিলন

পাঁচালি কবিগানের চেয়ে আরও নাটকীয়—নৃত্য, গান ও আবৃত্তির সমন্বয়। এর উৎপত্তি ‘পদচালন’ বা ‘নাচাড়ী’ থেকে বলে অনুমান। প্রাথমিকভাবে পৌরাণিক কাহিনী (রামায়ণ-পাচালি, মনসা-পাচালি) ভিত্তিক, কিন্তু সন্ধিপর্বে আধুনিক ঘটনা-কাহিনীতে রূপান্তরিত। গায়ক পায়ে নূপুর পরে ছড়া কাটতেন, অভিনয়ের ছোঁয়া থাকত।

পাঁচালির ঐশ্বর্যযুগ: ১৮২৫-১৮৬০। প্রধান রচয়িতা দাশরথি রায় (১৮১০-১৮৫৭), বর্ধমানের লোক। প্রথমে কবিগানে যোগ দেন, পরে পাঁচালিতে বিশেষজ্ঞ হন। ‘দক্ষযজ্ঞ’, ‘লবকুশের যুদ্ধ’, ‘নলিনীভ্রমরকথা’ প্রভৃতি পালায় অপূর্ব অনুপ্রাস ও সুরমাধুর্য। তাঁর গানের গতি দ্রুত, যেন ‘প্রসঙ্গ ভুলিয়ে শ্রোতা বিমুগ্ধ’। উপমার পাহাড় তৈরি করতেন, কিন্তু চরিত্রচিত্রণে অপটু। অশ্লীলতার দোষও আছে, যা যুগের রুচির প্রতিফলন। তবু, বৈষ্ণব-গানে (‘দোষ কারো নয় গে মা’) তাঁর মর্মস্পর্শীতা অসাধারণ।

পরবর্তীকালে রসিক রায়, নবীন চক্রবর্তী প্রমুখ পাঁচালি লিখেছেন। রবীন্দ্রনাথ বাল্যে দাশরথির গান শুনে মুগ্ধ হয়েছিলেন—কৃত্তিবাসের পয়ারকে অনুপ্রাসের ঝকঝকে করে তুলেছিলেন। পাঁচালি কবিগানের চেয়ে জটিল, কিন্তু লোকজনের আকর্ষণে অপরিসীম।

টপ্লা: হালকা গানের সুরেলা ধারা

টপ্লা (বা টগ্পা) কবিগানের একটি উপশাখা—হালকা, সুরেলা গান যা নিধুবাবু (রামনিধি গুপ্ত, ১৭৭০-১৮৫২) এর মতো গীতিকারদের দ্বারা সমৃদ্ধ। এটি বৈষ্ণব-গানের প্রভাবিত, কিন্তু বাণিজ্যিক আসরের জন্য উদ্ভূত। নিধুবাবুর টপ্লা-জাতের রচনায় পুরাতন ছন্দের সাথে নতুন সুরের মিলন ঘটে। এটি কবিগানের মতো প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নয়, বরং মনোরঞ্জনমূলক। সন্ধিপর্বে টপ্লা লোকসাধারণের দৈনন্দিন আনন্দের অংশ হয়ে ওঠে, যদিও এর সাহিত্যিক মূল্য কম।

যাত্রা: লোকনাট্যের উত্থান

যাত্রা সন্ধিপর্বের সবচেয়ে জীবন্ত ধারা—পুরোপুরি অভিনয়ভিত্তিক লোকনাট্য। এর উৎপত্তি পাঁচালি থেকে, যেখানে গান-নৃত্য-আবৃত্তি মিলে নাটকীয়তা তৈরি হয়। অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষে পুরাণ-কাহিনীতে যাত্রা শুরু, কিন্তু উনবিংশ শতাব্দীতে সমকালীন ঘটনা (যেমন সতীদাহ-বিরোধী যাত্রা) অন্তর্ভুক্ত হয়। তারাচরণ শিকদারকে আধুনিক যাত্রার আদিপুরুষ বলা হয়। যাত্রায় পুরুষ-স্ত্রী ভূমিকা একই অভিনেতা করতেন, গান-অভিনয়ের মিশ্রণে জনমন জয় করত। এটি সমাজ-সংস্কারের বাহকও হয়—রামমোহনের প্রভাবে ধর্মীয় আলোচনা প্রবেশ করে। যাত্রা আজও গ্রামীণ বাংলার অবিচ্ছেদ্য অংশ, কিন্তু সন্ধিপর্বে এর জন্মই বাঙালির নাট্যচেতনার ভিত্তি স্থাপন করে।

কবিগান, পাঁচালি, টপ্লা ও যাত্রা—এই ধারাগুলি সন্ধিপর্বে পুরাতন কাব্যভাবনায় নতুনত্বের সঞ্চার ঘটায়। এগুলি অশিক্ষিত কবি-শিল্পীদের দ্বারা গড়া, জনসাধারণের হৃদয়স্পর্শী। ইংরেজ-আমলে শহুরে সংস্কৃতির উত্থানে এদের পতন ঘটলেও, এরা বাঙালির সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অমূল্য সম্পদ। রবীন্দ্রনাথের মতো মহাকবিরাও এদের প্রভাব স্বীকার করেছেন। আজকের লোকসাহিত্য-অনুসন্ধানে এগুলি নতুন আলোয় উজ্জ্বল হয়ে ওঠে—জনগণের কণ্ঠস্বরের স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *