ধ্বনিবাদ ও রসবাদ: একটি বিশদ বিশ্লেষণ

ধ্বনিবাদ ও রসবাদ: একটি বিশদ বিশ্লেষণ

এই নথিটি ভারতীয় কাব্যতত্ত্বে ধ্বনি (Suggestion) এবং রস (Aesthetic Emotion)-এর মূলনীতিগুলির একটি সুসংহত বিশ্লেষণ উপস্থাপন করে। এর কেন্দ্রীয় বিষয়বস্তুটি আচার্য আনন্দবর্ধনের ‘ধ্বনিবাদ’ এবং ভরত মুনির ‘রসবাদ’-এর ওপর কেন্দ্র করে আবর্তিত, যা পরবর্তীতে অভিনবগুপ্তের দ্বারা সমন্বিত হয়েছিল। ধ্বনিকে কাব্যের আত্মা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে, যা বাচ্যার্থ বা আক্ষরিক অর্থকে অতিক্রম করে এক গভীরতর প্রতীয়মান বা ব্যঙ্গ্যার্থ প্রকাশ করে। এই ধ্বনির তিনটি প্রধান প্রকার—বস্তুধ্বনি, অলংকারধ্বনি এবং রসধ্বনি—এর মধ্যে রসধ্বনিকেই সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হয়, যা কাব্যের চূড়ান্ত লক্ষ্য হিসেবে রসাস্বাদনকে নির্দেশ করে। ভরত মুনির বিখ্যাত রসসূত্র “বিভাবানুভাবব্যভিচারিসংযোগাদ্রসনিষ্পত্তিঃ” ব্যাখ্যা করে যে কীভাবে বিভাব, অনুভাব এবং ব্যভিচারী ভাবের সংযোগের মাধ্যমে স্থায়ীভাব রসে রূপান্তরিত হয়। আনন্দবর্ধন নাট্যশাস্ত্রের রসতত্ত্বকে কাব্যশাস্ত্রের সঙ্গে সংযুক্ত করেন এবং অভিনবগুপ্ত এই ধারণাটিকে আরও শক্তিশালী করে প্রতিষ্ঠা করেন যে, রস কেবলমাত্র ধ্বনি বা ব্যঞ্জনার মাধ্যমেই আস্বাদনযোগ্য, বাচ্য বা আভিধানিক অর্থের মাধ্যমে নয়। ‘গাথাসপ্তশতী’-এর মতো ধ্রুপদী সাহিত্যকর্ম এই তত্ত্বগুলির বাস্তব প্রয়োগের उत्कृष्ट উদাহরণ হিসেবে কাজ করে, যেখানে গ্রামীণ জীবনের সাধারণ চিত্রকল্পের মাধ্যমে গভীর আবেগ ও অনুভূতি প্রকাশ করা হয়েছে।

——————————————————————————–

১. ধ্বনি তত্ত্ব: কাব্যের আত্মা

আচার্য আনন্দবর্ধন তাঁর ‘ধ্বন্যালোক’ গ্রন্থে “কাব্যাস্যাত্মা ধ্বনিঃ” উক্তিটির মাধ্যমে ধ্বনিকে কাব্যের আত্মা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছেন। তাঁর মতে, যে অর্থ কাব্যের বাচ্যার্থ (আক্ষরিক অর্থ) থেকে ভিন্ন এবং সহৃদয় পাঠকের কাছে প্রতীয়মান বা প্রকাশিত হয়, তাই হলো ধ্বনি।

ক. বাচ্যার্থ বনাম প্রতীয়মান অর্থ

আনন্দবর্ধনের মতে, কাব্যের দুটি অর্থ রয়েছে:

  • বাচ্যার্থ: এটি হলো শব্দের আভিধানিক বা মুখ্য অর্থ, যা সরাসরি বোঝা যায়।
  • প্রতীয়মান অর্থ (ব্যঙ্গ্যার্থ): এটি হলো প্রস্তাবিত, ব্যঞ্জনাময় বা আভাসিত অর্থ, যা বাচ্যার্থকে অতিক্রম করে পাঠকের মনে উদিত হয়। এই প্রতীয়মান অর্থটি নারীর বাহ্যিক সৌন্দর্যের অতিরিক্ত তার ভেতরের লাবণ্যের মতো, যা কেবল সহৃদয় পাঠকই অনুভব করতে পারেন।

যে কাব্যে বাচ্যার্থের চেয়ে ব্যঙ্গ্যার্থ অধিক চমৎকারিত্ব তৈরি করে, সেখানেই প্রকৃত ধ্বনির প্রকাশ ঘটে। আনন্দবর্ধনের ভাষায়:

“বাচ্যার্থাপেক্ষয়া যস্য ব্যঙ্গ্যস্য স্যাচ্চমৎকৃতিঃ। অধিকাসৌ ধ্বনির্জ্ঞেয়ঃ সদ্ভিঃ কাব্যস্বরূপভৃৎ।।”

খ. ধ্বনির প্রকারভেদ

ধ্বনি প্রধানত তিন প্রকারের হয়, যা ব্যঙ্গ্যার্থের প্রকৃতির ওপর নির্ভর করে।

  1. বস্তুধ্বনি: যখন ব্যঙ্গ্যার্থ কোনো বস্তু বা তথ্য (fact) হয়।
  2. অলংকারধ্বনি: যখন ব্যঙ্গ্যার্থ কোনো অলংকার (figure of speech) হয়।
  3. রসধ্বনি: যখন ব্যঙ্গ্যার্থ কোনো রস বা ভাব হয়, যেমন—শৃঙ্গার, করুণ ইত্যাদি।

এই তিন প্রকারের মধ্যে আনন্দবর্ধন রসধ্বনিকেই সর্বশ্রেষ্ঠ বলে মনে করেছেন। তাঁর মতে, বস্তু এবং অলংকারের ব্যঞ্জনাও কাব্যের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে, কিন্তু কাব্যের মূল উদ্দেশ্য হলো রস সৃষ্টি করা। তাই রসধ্বনিই হলো ধ্বনির সারবস্তু।

২. রস তত্ত্ব: উৎস ও উপাদান

রসতত্ত্বের মূল উৎস হলো ভরত মুনির ‘নাট্যশাস্ত্র’। তিনি নাটকের প্রেক্ষাপটে রসকে সংজ্ঞায়িত করেছিলেন, যা পরবর্তীতে কাব্যতত্ত্বেও গৃহীত হয়।

ক. ভরত মুনির রসসূত্র

ভরতের বিখ্যাত রসসূত্রটি হলো:

“বিভাবানুভাবব্যভিচারিসংযোগাদ্রসনিষ্পত্তিঃ”

অর্থাৎ, বিভাব, অনুভাব এবং ব্যভিচারী ভাবের সংযোগের ফলে রসের নিষ্পত্তি বা উৎপত্তি হয়। এই উপাদানগুলির সম্মিলিত প্রভাবেই দর্শকের মনে স্থায়ীভাব রসে রূপান্তরিত হয়।

উপাদানসংজ্ঞা ও ব্যাখ্যা
বিভাব (Vibhava)যে কারণগুলির দ্বারা রসের উদ্রেক হয়। এটি দুই প্রকার: আলম্বন বিভাব (যার ওপর ভিত্তি করে রস উৎপন্ন হয়, যেমন—নায়ক-নায়িকা) এবং উদীপন বিভাব (যা রসকে উদ্দীপিত করে, যেমন—চাঁদনী রাত, বসন্তকাল)।
অনুভাব (Anubhava)বিভাবের কারণে উৎপন্ন মানসিক ভাবের বাহ্যিক প্রকাশ, যেমন—কটাক্ষ, অশ্রুপাত, রোমাঞ্চ ইত্যাদি।
ব্যভিচারী ভাব (Vyabhichari Bhava)এগুলি সঞ্চারী ভাব নামেও পরিচিত। এই ক্ষণস্থায়ী ভাবগুলি মূল স্থায়ীভাবকে পুষ্ট করে এবং রসের দিকে নিয়ে যায়, যেমন—চিন্তা, গ্লানি, লজ্জা, হর্ষ ইত্যাদি। এদের সংখ্যা তেত্রিশটি বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
স্থায়ীভাব (Sthayi Bhava)মানুষের মনে সুপ্ত অবস্থায় থাকা স্থায়ী মানসিক অবস্থা, যা বিভাব, অনুভাব ও ব্যভিচারী ভাবের দ্বারা উদ্বুদ্ধ হয়ে রসে পরিণত হয়।

খ. রসের প্রকারভেদ

ভরত মুনি নাট্যশাস্ত্রে আটটি রসের কথা উল্লেখ করেছেন। পরবর্তীতে শান্ত রসকে নবম রস হিসেবে যুক্ত করা হয়। প্রতিটি রসের সঙ্গে একটি নির্দিষ্ট স্থায়ীভাব যুক্ত থাকে।

  • আটটি প্রধান রস: শৃঙ্গার, হাস্য, করুণ, রৌদ্র, বীর, ভয়ানক, বীভৎস এবং অদ্ভুত।
  • পরবর্তী সংযোজন: শান্ত রস।

এছাড়াও ভরত আটটি সাত্ত্বিক ভাবের উল্লেখ করেছেন, যেমন—স্তম্ভ, স্বেদ, রোমাঞ্চ ইত্যাদি, যেগুলি অনুভাবের অন্তর্গত।

৩. ধ্বনি ও রসের সমন্বয়

আনন্দবর্ধনের পূর্বে রস মূলত নাট্যের বিষয় হিসেবে বিবেচিত হতো। তাঁর সবচেয়ে বড় অবদান হলো নাট্যশাস্ত্রের রসতত্ত্বকে কাব্যশাস্ত্রের কেন্দ্রে স্থাপন করা।

  • আনন্দবর্ধনের দৃষ্টিভঙ্গি: তিনি দেখিয়েছেন যে কাব্যের চূড়ান্ত উদ্দেশ্য হলো রস সৃষ্টি, এবং এই রস বাচ্য বা আক্ষরিকভাবে প্রকাশ করা যায় না, এটিকে ব্যঞ্জনার মাধ্যমেই প্রকাশ করতে হয়। তাই, রসধ্বনিই হলো কাব্যের সর্বোচ্চ রূপ।
  • অভিনবগুপ্তের ব্যাখ্যা: আচার্য অভিনবগুপ্ত আনন্দবর্ধনের তত্ত্বকে আরও বিশদভাবে ব্যাখ্যা করেন। তিনি স্পষ্টভাবে প্রতিষ্ঠা করেন যে রস কেবল ব্যঙ্গ্য (suggested)। বিভাব, অনুভাব ইত্যাদির বর্ণনার মাধ্যমে পাঠকের মনে যে স্থায়ীভাব জেগে ওঠে এবং তা আস্বাদনের পর্যায়ে পৌঁছায়, সেই প্রক্রিয়াটিই হলো রসাস্বাদন, এবং এটি ধ্বনির মাধ্যমেই সম্ভব। রস কখনোই বাচ্য হতে পারে না।

এই সমন্বয়ের ফলে ভারতীয় কাব্যতত্ত্বে ‘রসধ্বনি’ একটি কেন্দ্রীয় এবং অপরিহার্য ধারণা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।

৪. তত্ত্বের প্রায়োগিক উদাহরণ: ‘গাথাসপ্তশতী’

‘গাথাসপ্তশতী’ হলো প্রাকৃত ভাষায় রচিত একটি কাব্যসংকলন, যা গ্রামীণ জীবনের প্রেম, বিরহ ও দৈনন্দিন ঘটনাকে কেন্দ্র করে লেখা হয়েছে। এই কাব্যটি ধ্বনি ও রসতত্ত্বের প্রায়োগিক প্রয়োগের এক চমৎকার উদাহরণ।

  • বিষয়বস্তু: এই কাব্যের কবিতাগুলিতে সাধারণ কৃষক, শিকারি এবং গোপনারীদের জীবনের সহজ-সরল চিত্র ফুটে উঠেছে। এখানে অলংকারের বাহুল্য নেই, বরং সহজ ভাষায় গভীর অনুভূতি প্রকাশ করা হয়েছে।
  • ধ্বনির প্রয়োগ: ‘গাথাসপ্তশতী’-এর একটি বিখ্যাত গাথায় গোদাবরী নদীর তীরের বেতসকুঞ্জের বর্ণনা দেওয়া হয়েছে, যেখানে এক তরুণী তার প্রেমিককে একটি নির্জন স্থানের ইঙ্গিত দিচ্ছে। এখানে কোনো explicit কথা ছাড়াই, কেবল পরিবেশের বর্ণনার মাধ্যমে একটি গোপন অভিসারের ব্যঞ্জনা তৈরি করা হয়েছে। এটি বস্তু বা ঘটনা ध्वনির একটি उत्कृष्ट উদাহরণ।
  • রসের সৃষ্টি: এই কবিতাগুলি পাঠ করলে পাঠকের মনে শৃঙ্গার রসের উদ্রেক হয়। প্রেমের আকাঙ্ক্ষা, গোপনীয়তা, এবং প্রকৃতির সঙ্গে মানব আবেগের মিশ্রণ এক অনবদ্য রসানুভূতি সৃষ্টি করে। কবি হালের কৃতিত্ব এখানেই যে তিনি সাধারণ মানুষের জীবনের খণ্ডচিত্রের মাধ্যমে সর্বজনীন আবেগ ও রসের প্রকাশ ঘটিয়েছেন।

সুতরাং, ‘গাথাসপ্তশতী’-এর মতো কাব্য প্রমাণ করে যে, কাব্যের সার্থকতা নিহিত রয়েছে তার বাচ্যার্থে নয়, বরং তার ব্যঞ্জনায়, যা পাঠকের হৃদয়ে রস সৃষ্টি করতে সক্ষম।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *