বাংলা গদ্য ও শ্রীরামপুর মিশন

বাংলা গদ্য ও শ্রীরামপুর মিশন

উনবিংশ শতাব্দীতে বাংলা সাহিত্যের নবজাগরণের পটভূমিতে গদ্যসাহিত্যের বিকাশ একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। প্রাচীনকালে বাংলা গদ্যের কিছু নিদর্শন পাওয়া গেলেও, এর প্রকৃত রূপান্তর ঘটে ইংরেজ আমলে, বিশেষ করে খ্রিস্টান মিশনারীদের প্রভাবে। এর মধ্যে শ্রীরামপুর ব্যাপটিস্ট মিশনের ভূমিকা অপরিসীম। এই মিশন শুধু ধর্মপ্রচারের কেন্দ্রই ছিল না, বরং বাংলা গদ্যের ভিত্তি স্থাপন, মুদ্রণকলার প্রসার এবং সংবাদপত্রের উদ্ভবের মাধ্যমে সাহিত্যিক বিপ্লবের অন্যতম সূচনাকারী হিসেবে পরিচিত। এই প্রবন্ধে আমরা শ্রীরামপুর মিশনের সাংস্কৃতিক অবদান এবং বাংলা গদ্যের বিকাশের সাথে তার সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা করব।

শ্রীরামপুর মিশনের প্রতিষ্ঠা

শ্রীরামপুর মিশনের ইতিহাস ১৮০০ খ্রিস্টাব্দের সাথে জড়িত। বাংলায় খ্রিস্টধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্যে ইংল্যান্ডের ব্যাপটিস্ট মিশনারি সোসাইটি উইলিয়াম কেরী এবং জoshua marshman-এর মতো প্রচারকদের পাঠায়। কলকাতায় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কর্মচারীদের বিরোধিতায় তারা স্থান পাননি। ফলে, ডেনিশ উপনিবেশ শ্রীরামপুরে (সেরামপুর) ১৮০০ সালের ১২ জানুয়ারি মিশন প্রতিষ্ঠা হয়। পরবর্তীকালে উইলিয়াম ওয়ার্ড, জন মার্শম্যান প্রমুখ যোগ দেন। এই মিশন ধর্মপ্রচারের পাশাপাশি শিক্ষা, মুদ্রণ এবং সাহিত্যিক কার্যকলাপে নিযুক্ত হয়। বাংলা গদ্যের বিকাশে এর দান অপরিসীম, কারণ এখান থেকেই গদ্যের প্রথম সুশৃঙ্খল অনুশীলন শুরু হয়।

বাইবেল অনুবাদ এবং গদ্যের প্রথম নিদর্শন

শ্রীরামপুর মিশনের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য অবদান হলো বাইবেলের বাংলা অনুবাদ। কেরী নিজে ১৮০১ সালে মথুর সুসমাচার (ম্যাথিউর গসপেল) অনুবাদ করে “মঙ্গল সমাচার” নামে প্রকাশ করেন। এতে তার মুন্সি রামরাম বসু সহায়তা করেন। পরবর্তীকালে পুরো নিউ টেস্টামেন্ট (১৮০১) এবং ওল্ড টেস্টামেন্টের কিছু অংশ অনুবাদ হয়। ১৮০৭ সালে সম্পূর্ণ বাইবেল “ধর্মপুস্তক” নামে প্রকাশিত হয়।

এই অনুবাদগুলি বাংলা গদ্যের প্রথম উন্নত নিদর্শন হিসেবে বিবেচিত। যদিও এগুলো “বাইবেলী বাংলা” বা “মিশনারী বাংলা” নামে সমালোচিত হয়েছে (কারণ এতে ধর্মীয় প্রভাব স্পষ্ট), তবু এরা গদ্যের সরলতা, বাক্যগঠন এবং চলিত ভাষার ব্যবহারের পথ দেখায়। এর ফলে বাঙ্গালী লেখকরা গদ্যরচনায় আকৃষ্ট হন এবং ধর্ম, দর্শন, জীবনচরিত্রের মতো বিষয়ে লেখার প্রচেষ্টা শুরু করেন।

মুদ্রণয়ন্ত্রের প্রতিষ্ঠা এবং প্রকাশনা

শ্রীরামপুর মিশনের আরেকটি মাইলফলক ছিল মুদ্রণয়ন্ত্রের প্রতিষ্ঠা। ১৮০০ সাল থেকেই ছাপাখানা চালু হয় এবং ১৮০১ সালে প্রথম সংবাদপত্র ছাপা হয়। পরবর্তী ৩৩ বছরে এই প্রেস থেকে ৩৩টি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়, যার মধ্যে কৃত্তিবাসী রামায়ণ, বিভিন্ন শাস্ত্রগ্রন্থ এবং ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের রচনাবলী অন্তর্ভুক্ত। এই মুদ্রণকলা বাংলা সাহিত্যের সাংস্কৃতিক বিপ্লবের সূচনা করে। গ্রন্থরচনার আবহ সৃষ্টি হয় এবং লেখকরা নির্ভয়ে প্রকাশের সুযোগ পান।

মিশনারীরা বাংলা গদ্যকে ধর্মপ্রচারের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করলেও, এর ফলে জ্ঞানবিজ্ঞানের আলোচনা, সমাজসংস্কারের প্রচেষ্টা এবং যুক্তিবাদী চিন্তার প্রসার ঘটে। উদাহরণস্বরূপ, “থ্রীস্ট বিবরণামৃত” নামে খ্রিস্টজীবনী প্রকাশিত হয়, যা গদ্যের নতুন ধারা প্রবর্তন করে।

সংবাদপত্রের উদ্ভব এবং গদ্যের প্রসার

শ্রীরামপুর মিশন বাংলা সংবাদপত্রের জন্মদাতাও। ১৮১৮ সালের এপ্রিলে মার্শম্যানের সম্পাদনায় “দিগদর্শন” (মাসিক) প্রকাশিত হয়, যার উদ্দেশ্য ছিল যুবকদের জন্য উপদেশমূলক লেখা। একই বছরের মে মাসে “সমাচার দর্পণ” (সাপ্তাহিক) শুরু হয়। এই পত্রিকায় সরল গদ্যে সমাজের বীতিনীতি, হিন্দুধর্মের সমালোচনা এবং সংবাদ পরিবেশন করা হতো। জয়গোপাল তর্কালঙ্কার, তারিণীচরণ শিরোমণি প্রমুখ বাঙ্গালী পণ্ডিতরা সম্পাদনায় সহায়তা করেন।

এই পত্রিকাগুলি বাংলা গদ্যকে জনপ্রিয় করে তোলে। ধর্মীয় বিতর্কের ফলে রামমোহন রায়ের নেতৃত্বে ১৮২১ সালে “সংবাদ কৌমুদী” প্রকাশিত হয়, যা মিশনারীদের বিরোধিতা করে। এই তর্কযুদ্ধ গদ্যের প্রকাশভঙ্গিকে সূক্ষ্ম করে এবং প্রবন্ধরচনার ধারা গড়ে তোলে। গঙ্গাকিশোর ভট্টাচার্যও “বাঙ্গাল গেজেটি” প্রকাশ করেন। সংবাদপত্রের মাধ্যমে গদ্যচর্চা প্রসার লাভ করে এবং পরবর্তীকালে বঙ্কিমচন্দ্র, প্যারীচাঁদ মিত্র প্রমুখের প্রবন্ধসাহিত্যের ভিত্তি তৈরি হয়।

ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের সাথে তুলনামূলক আলোচনা

শ্রীরামপুর মিশনের পাশাপাশি ফোর্ট উইলিয়ম কলেজ (১৮০০)ও বাংলা গদ্যের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ। কলেজে মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালঙ্কার, রামরাম বসু প্রমুখ “বত্রিশ সিংহাসন”, “রাজাবলী”, “প্রবোধচন্দ্রিকা” রচনা করেন। এগুলো মৌলিক এবং চলিত রীতির, যেখানে মিশনের অনুবাদগুলো ধর্মকেন্দ্রিক। মিশন গদ্যকে প্রচারের হাতিয়ার করে, কলেজ গল্প-ইতিহাস-দর্শনের মাধ্যমে বৈচিত্র্য যোগ করে। উভয়ের সম্মিলিত প্রভাবে সাধু ও চলিত রীতির দুই ধারা গড়ে ওঠে, যা পরে বঙ্কিমীয় গদ্যের ভিত্তি হয়।

শ্রীরামপুর মিশন বাংলা গদ্যকে নিদ্রাভঙ্গের ঘুম থেকে জাগিয়ে তোলে। এর অনুবাদ, মুদ্রণ এবং সংবাদপত্রের মাধ্যমে গদ্য সরল, যুক্তিবাদী এবং জনপ্রিয় হয়। যদিও এর পিছনে ধর্মপ্রচারের উদ্দেশ্য ছিল, ফলস্বরূপ বাংলা সাহিত্যের আধুনিক যুগের সূচনা হয়। এই অবদানের জন্য কেরী, মার্শম্যান প্রমুখকে স্মরণীয় বলে মনে রাখতে হবে। আজকের বাংলা গদ্যের বৈচিত্র্যে শ্রীরামপুরের ছায়া এখনও দৃশ্যমান।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *