বাংলা ছন্দ ও অলংকারের রূপরেখা

বাংলা ছন্দ ও অলংকারের রূপরেখা

এই নথিটি প্রদত্ত উৎস থেকে বাংলা ছন্দ ও অলংকারের একটি বিশদ বিশ্লেষণ এবং সংক্ষিপ্তসার উপস্থাপন করে। এর মূল উদ্দেশ্য হলো বাংলা ছন্দের সংজ্ঞা, মৌলিক উপাদান, শ্রেণিবিভাগ এবং ঐতিহাসিক বিবর্তনের একটি সামগ্রিক চিত্র তুলে ধরা।

নথির প্রধান বিষয়াবলীর মধ্যে রয়েছে ছন্দের তিনটি প্রধান প্রকারের বিশদ আলোচনা: স্বরবৃত্ত, মাত্রাবৃত্ত এবং অক্ষরবৃত্ত। প্রতিটি ছন্দের গঠন, মাত্রা গণনারীতি এবং বৈশিষ্ট্য উদাহরণসহ ব্যাখ্যা করা হয়েছে। এতে বাংলা ছন্দের ঐতিহাসিক ক্রমবিকাশকে পাঁচটি পর্বে বিভক্ত করে বিশ্লেষণ করা হয়েছে: আদি পর্ব (চর্যাপদ), মধ্যযুগীয় পর্ব (শ্রীকৃষ্ণকীর্তন, বৈষ্ণব পদাবলী), ক্লাসিক্যাল পর্ব (মাইকেল মধুসূদন দত্ত), রোমান্টিক পর্ব (রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম), এবং আধুনিক ও উত্তরাধুনিক পর্ব।

প্রতিটি পর্বে ছন্দের বিবর্তন, প্রধান কবিদের অবদান এবং নতুন ছন্দোরীতি প্রবর্তনের তাৎপর্য তুলে ধরা হয়েছে। মাইকেল মধুসূদন দত্তের অমিত্রাক্ষর ছন্দ ও সনেট প্রবর্তন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গদ্যছন্দ ও মাত্রাবৃত্তের পরিಷ್করণ, এবং কাজী নজরুল ইসলামের ছন্দে গতি ও বীররস সঞ্চারের মতো যুগান্তকারী পরিবর্তনগুলো বিশেষভাবে আলোচিত হয়েছে। সবশেষে, কাব্যভাষার সৌন্দর্যবর্ধনে অলংকারের ভূমিকা এবং এর প্রধান দুটি শ্রেণি—শব্দালংকার ও অর্থালংকার—সম্পর্কেও একটি সংক্ষিপ্ত ধারণা দেওয়া হয়েছে। এই নথিটি বাংলা ছন্দের গঠন ও বিকাশের একটি সম্পূর্ণ ও তথ্যসমৃদ্ধ বিবরণ প্রদানের লক্ষ্যে সংকলিত হয়েছে।

——————————————————————————–

১. ছন্দ ও অলংকারের সংজ্ঞা

কাব্য এবং সাহিত্যের সৌন্দর্য ও মাধুর্য নির্মাণে ছন্দ ও অলংকার দুটি মৌলিক উপাদান হিসেবে কাজ করে। এদের সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা ও পার্থক্য রয়েছে।

১.১. ছন্দ (Prosody)

ছন্দ হলো কবিতার সঙ্গীতময় ও সুশৃঙ্খল রূপ, যা শব্দের ধ্বনিগত বিন্যাসের মাধ্যমে তৈরি হয়। বিভিন্ন ವಿದগ্ধজনেরা ছন্দের নানা সংজ্ঞা প্রদান করেছেন।

  • সাধারণ সংজ্ঞা: শ্রুতিমধুর করার জন্য শব্দের পরিশীলিত ও পরিমার্জিত ব্যবহার বাক্যে যে দোলা বা ঢেউয়ের সৃষ্টি করে, তাকে ছন্দ বলে। বুনন ও উচ্চারণের তারতম্যে নির্মিত এই শব্দ-স্রোত বিভিন্ন আবহ তৈরি করে।
  • রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতে: “শব্দকে তার জড় ধর্ম থেকে মুক্তি দেওয়াই হচ্ছে ছন্দ।” অর্থাৎ, শব্দের সাধারণ অর্থের বাইরে একটি ধ্বনিময় রূপ দেওয়া।
  • অন্যান্য উদ্ধৃতি:
    • স্যামুয়েল জনসন: “Poetry is Metrical Composition.”
    • ম্যাকালে: “We mean the art of employing words in such a manner as to produce illusion on the imagination.”
    • রবীন্দ্রনাথ আরও বলেন: “Musical thought”।

মূলত, ভাষার অন্তর্নিহিত ধ্বনি-তরঙ্গকে একটি সুনির্দিষ্ট বিন্যাসে সাজিয়ে যে শ্রুতিমধুর রূপ দেওয়া হয়, তাই ছন্দ।

১.২. অলংকার (Rhetoric)

সংস্কৃত ‘অলম্’ শব্দের অর্থ ভূষণ। যা দ্বারা ভূষিত বা সজ্জিত করা হয়, তাকেই অলংকার বলা হয়। কাব্যের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করার কৌশলই হলো অলংকার, যা ইংরেজিতে ‘Figures of speech’ বা ‘Aesthetic of Poetry’ নামে পরিচিত।

  • সংজ্ঞা: কাব্যদেহে শব্দ ও অর্থের যে-সমস্ত পরিকল্পনা দ্বারা সৌন্দর্যের সৃষ্টি হয়, তাকেই অলংকার বলে।
  • উদ্দেশ্য: অলংকারের প্রধান উদ্দেশ্য হলো কাব্যকে আরও আকর্ষণীয় ও চিত্তাকর্ষক করে তোলা। আচার্য বামন কাব্যের সৌন্দর্য প্রসঙ্গে বলেছেন, “সৌন্দর্য্যম্ অলংকারঃ।”

অলংকার কাব্যের বহিরঙ্গ ও অন্তরঙ্গ—উভয় সৌন্দর্যই বৃদ্ধি করে।

২. ছন্দের মূল উপাদানসমূহ

বাংলা ছন্দের গঠন বুঝতে এর মৌলিক উপাদানগুলো সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা থাকা আবশ্যক।

উপাদানবর্ণনা
অক্ষর বা দল (Syllable)শব্দের উচ্চারণের ন্যূনতম একক বা এক ঝোঁকে উচ্চারিত ধ্বনিগুচ্ছ। অক্ষর দুই প্রকার: ১) মুক্তাক্ষর (Open syllable): যে অক্ষরের শেষে স্বরধ্বনি থাকে (যেমন: ক, খা, চি)। ২) বদ্ধাক্ষর (Closed syllable): যে অক্ষরের শেষে ব্যঞ্জনধ্বনি থাকে (যেমন: মন্, হাত্, চিৎ)।
মাত্রা (Mora)একটি অক্ষর উচ্চারণে যে সময় লাগে, তার পরিমাপকে মাত্রা বলে। বাংলা ছন্দে কোন অক্ষরে কত মাত্রা 부여 করা হবে, তা ছন্দের প্রকৃতির উপর নির্ভরশীল।
পর্ব (Foot/Measure)কবিতার প্রতিটি চরণের মধ্যে ছন্দের প্রয়োজনে কিছু অংশে ভাগ করা হয়, এই প্রতিটি অংশকে পর্ব বলে। এটি ছন্দের মূল একক। পর্ব পূর্ণ, অপূর্ণ, অতিপূর্ণ বা খণ্ড পর্ব হতে পারে।
যতি (Caesura/Pause)কবিতার চরণে শ্বাসগ্রহণ বা অর্থ প্রকাশের সুবিধার্থে যে বিরাম বা বিরতি নেওয়া হয়, তাকে যতি বলে। এটি দুই প্রকার: ১) অর্থযতি বা ভাবযতি (Sense pause): অর্থের জন্য বিরতি। ২) ছন্দোযতি (Metrical pause): ছন্দের জন্য বিরতি।
চরণ (Line/Verse)কবিতার এক একটি পঙক্তিকে চরণ বলা হয়। সাধারণত এক বা একাধিক পর্ব নিয়ে একটি চরণ গঠিত হয়।
স্তবক (Stanza)একাধিক চরণ মিলে যখন একটি অখণ্ড ভাব প্রকাশ করে, তখন তাকে স্তবক বলে। বাংলা কবিতায় দুই থেকে দশ চরণের স্তবক দেখা যায়।
মিল (Rhyme)দুই বা ততোধিক পর্ব বা চরণের শেষে অবস্থিত ধ্বনিগুচ্ছের সাদৃশ্যকে মিল বলে। এটি ছন্দের শ্রুতিমাধুর্য বহুগুণে বৃদ্ধি করে।

৩. বাংলা ছন্দের শ্রেণিবিভাগ

গঠন ও মাত্রা গণনার রীতির ওপর ভিত্তি করে বাংলা ছন্দকে প্রধানত তিনটি ভাগে ভাগ করা হয়।

৩.১. স্বরবৃত্ত ছন্দ (Stress-based Meter)

এটি বাংলা ভাষার সবচেয়ে প্রাচীন এবং মৌখিক ধারার ছন্দ। এর অন্যান্য নাম হলো দলবৃত্ত বা লৌকিক ছন্দ।

  • বৈশিষ্ট্য:
    • এটি মূলত শ্বাসাঘাত-প্রধান। পর্বের প্রথম অক্ষরের উপর একটি জোর বা শ্বাসাঘাত পড়ে।
    • মাত্রা গণনার নিয়ম অত্যন্ত সরল: সব অক্ষর, তা মুক্ত বা বদ্ধ যা-ই হোক না কেন, ১ মাত্রা হিসেবে গণনা করা হয়।
    • এর লয় বা গতি দ্রুত হয়, যা ছড়া, গান বা লৌকিক কবিতার জন্য উপযুক্ত।
    • সাধারণত এর পর্বগুলো ৪ মাত্রার হয়ে থাকে।

৩.২. মাত্রাবৃত্ত ছন্দ (Quantitative Meter)

এই ছন্দের ভিত্তি অক্ষরের উচ্চারণকালের পরিমাপ। একে কলামাত্রিক বা কলাবৃত্ত ছন্দও বলা হয়।

  • বৈশিষ্ট্য:
    • এই ছন্দে অক্ষরের উচ্চারণকালের উপর মাত্রা নির্ভর করে।
    • মাত্রা গণনা: মুক্তাক্ষর ১ মাত্রা এবং বদ্ধাক্ষর ২ মাত্রা হিসেবে গণনা করা হয়।
    • এর লয় ধীর বা বিলম্বিত, যা গীতিধর্মী ও আবেগপ্রধান কবিতার জন্য বিশেষভাবে উপযোগী।
    • সাধারণত এর পর্বগুলো ৪, ৫, ৬ বা ৭ মাত্রার হয়ে থাকে।

৩.৩. অক্ষরবৃত্ত ছন্দ (Syllabic Meter)

এটি স্বরবৃত্ত ও মাত্রাবৃত্তের একটি মিশ্র রূপ, তাই একে মিশ্রবৃত্ত বা মিশ্রকলাবৃত্ত ছন্দও বলা হয়। বাংলা সাহিত্যের ধ্রুপদী ধারার ছন্দ এটি।

  • বৈশিষ্ট্য:
    • এর মাত্রা গণনা বেশ জটিল এবং শব্দের মধ্যে অক্ষরের অবস্থানের ওপর নির্ভরশীল।
    • মাত্রা গণনা:
      • মুক্তাক্ষর সর্বদা ১ মাত্রা।
      • শব্দের আদিতে বা মধ্যে অবস্থিত বদ্ধাক্ষর ১ মাত্রা।
      • শব্দের শেষে অবস্থিত বদ্ধাক্ষর ২ মাত্রা।
      • একাক্ষর শব্দ যদি বদ্ধাক্ষর হয়, তবে তা ২ মাত্রা।
    • এর লয় ধীর ও গম্ভীর, যা বর্ণনামূলক, আখ্যানমূলক বা চিন্তাশীল কবিতার জন্য উপযুক্ত।
    • এর সবচেয়ে জনপ্রিয় রূপ হলো পয়ার, যার গঠন ৮+৬ মাত্রার দুটি পর্বে বিভক্ত।

৪. বাংলা ছন্দের ঐতিহাসিক বিবর্তন

বাংলা ছন্দের বিকাশকে তার ঐতিহাসিক যাত্রাপথে পাঁচটি প্রধান পর্বে ভাগ করে বিশ্লেষণ করা যেতে পারে।

৪.১. আদি পর্ব (আনুমানিক ৮ম থেকে ১২শ শতক)

এই পর্বের একমাত্র লিখিত নিদর্শন হলো চর্যাপদ। হরপ্রসাদ শাস্ত্রী কর্তৃক ১৯০৭ সালে নেপাল থেকে আবিষ্কৃত এই পুঁথিটি বাংলা ভাষার আদিতম লিখিত রূপ।

  • ছন্দের প্রকৃতি:
    • চর্যাপদের ছন্দ কোনো সুনির্দিষ্ট কাঠামোতে আবদ্ধ ছিল না। এটি ছিল মূলত একটি মিশ্র রীতির ছন্দ।
    • এতে স্বরবৃত্তের আভাস, প্রাচীন মাত্রাবৃত্তের চাল এবং অক্ষরবৃত্তের (পয়ার) প্রাথমিক রূপ পরিলক্ষিত হয়।
    • মাত্রা ঠিক রাখার জন্য কবিরা শব্দের সংকোচন (হ্রস্বধ্বনিকে বাদ দেওয়া) এবং প্রসারণ (হ্রস্বধ্বনিকে দীর্ঘ করে বা যুক্তাক্ষরকে ২ মাত্রা ধরে) কৌশলের আশ্রয় নিতেন।
    • পঙক্তিগুলো সাধারণত ১৬ মাত্রার হলেও পর্ব বিভাজন সর্বত্র সমান ছিল না।
    • অন্ত্যমিল বা চরণের শেষে মিল রাখার প্রবণতা স্পষ্টভাবে দেখা যায়।

৪.২. মধ্যযুগীয় পর্ব (১৩শ থেকে ১৮শ শতক)

এই দীর্ঘ সময়ে বাংলা ছন্দের গঠন, বিশেষ করে অক্ষরবৃত্তের পয়ার, একটি সুস্থিত রূপ লাভ করে।

  • শ্রীকৃষ্ণকীর্তন: বড়ু চণ্ডীদাসের এই কাব্যে অক্ষরবৃত্ত ছন্দ ব্যবহৃত হলেও তাতে মাত্রাবৃত্তের দিকে ঝুঁকে পড়ার প্রবণতা দেখা যায়, বিশেষ করে যেখানে যুক্তাক্ষর কম।
  • বৈষ্ণব পদাবলী: বিদ্যাপতি, চণ্ডীদাস, জ্ঞানদাস, গোবিন্দদাস প্রমুখ কবির পদে ছন্দের নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা দেখা যায়। এই সময়েই অক্ষরবৃত্ত ছন্দ থেকে মাত্রাবৃত্ত ছন্দের স্বাতন্ত্র্য স্পষ্ট হতে শুরু করে। সংকোচন-প্রসারণের ব্যবহার থাকলেও তা ক্রমশ কমে আসে।
  • মঙ্গলকাব্য ও অন্যান্য: মঙ্গলকাব্যগুলোতে অক্ষরবৃত্ত ছন্দের পয়ার (৮+৬) এবং ত্রিপদী (৮+৮+১০) রূপ দুটি দৃঢ় ভিত্তি লাভ করে এবং বাংলা কাব্যের প্রধান ছন্দে পরিণত হয়। এই পর্বের শেষ দিকে ভারতচন্দ্র রায়গুণাকর ছন্দের ব্যবহারে অসাধারণ कुशलता দেখান।

৪.৩. ক্লাসিক্যাল পর্ব (উনিশ শতক)

এই পর্বের প্রধান পুরুষ মাইকেল মধুসূদন দত্ত। তিনি বাংলা ছন্দকে মধ্যযুগীয় পয়ারের একঘেয়েমি থেকে মুক্তি দেন।

  • অমিত্রাক্ষর ছন্দ (Blank Verse): মধুসূদনের শ্রেষ্ঠ কীর্তি হলো অমিত্রাক্ষর ছন্দের প্রবর্তন। তিনি পয়ারের ৮+৬ মাত্রার কাঠামো ঠিক রেখে চরণের শেষে মিল তুলে দেন এবং যতি বা ভাবযতিকে চরণের শেষে সীমাবদ্ধ না রেখে চরণের যেকোনো স্থানে স্থাপনের স্বাধীনতা দেন। এর ফলে ভাব এক চরণ থেকে আরেক চরণে অবাধে প্রবাহিত হওয়ার সুযোগ পায় এবং কবিতা গদ্যের মতো সাবলীলতা লাভ করে।
  • সনেট (Sonnet): মধুসূদন ইতালীয় কবি পেত্রার্কের অনুকরণে বাংলা ভাষায় প্রথম সনেট রচনা করেন। ১৪ চরণের এই কবিতায় ভাবের একটি সুনির্দিষ্ট কাঠামো (অষ্টক ও ষটক) এবং অন্ত্যমিলের একটি বিশেষ রীতি অনুসরণ করা হয়।

৪.৪. রোমান্টিক পর্ব (উনিশ শতকের শেষভাগ থেকে বিংশ শতকের প্রথমার্ধ)

এই পর্বের নেতৃত্বে ছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং তাঁকে অনুসরণ করে আসেন কাজী নজরুল ইসলাম ও সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের মতো প্রভাবশালী কবিরা।

  • রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অবদান:
    • মাত্রাবৃত্তের মুক্তি: ‘মানসী’ কাব্যের শেষ দিকে তিনি অক্ষরবৃত্তের প্রভাব থেকে মাত্রাবৃত্তকে সম্পূর্ণ মুক্ত করে একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ ও গীতিময় ছন্দে পরিণত করেন।
    • স্বরবৃত্তের ব্যবহার: লৌকিক ছড়া বা হালকা কবিতার ছন্দ হিসেবে পরিচিত স্বরবৃত্তকে তিনি ভাবগম্ভীর ও গভীর আবেদনময় কবিতা রচনার কাজে ব্যবহার করেন।
    • মহাপয়ার: পয়ারের ৮+৬ মাত্রার গঠনকে বাড়িয়ে তিনি ৮+১০ মাত্রার মহাপয়ার সৃষ্টি করেন।
    • গদ্যছন্দ: কবিতার পর্ববিন্যাসকে গদ্যের স্বাভাবিক চালের ওপর স্থাপন করে তিনি গদ্যছন্দ বা মুক্তছন্দের প্রবর্তন করেন, যা আধুনিক কবিতার পথ খুলে দেয়।
  • কাজী নজরুল ইসলামের অবদান:
    • তিনি ছন্দে অভূতপূর্ব গতি, শক্তি ও বীররস সঞ্চার করেন। মাত্রাবৃত্ত ছন্দে ‘বিদ্রোহী’ কবিতার মাধ্যমে তিনি যে উদ্দাম গতির সৃষ্টি করেন, তা বাংলা কাব্যে নতুন। স্বরবৃত্ত ছন্দে ‘চল্ চল্ চল্’ এর মতো রণসঙ্গীত রচনা করে তিনি এই ছন্দের সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেন।
  • সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের অবদান:
    • “ছন্দের জাদুকর” নামে পরিচিত সত্যেন্দ্রনাথ ধ্বনি-সামঞ্জস্য এবং শব্দ-বিন্যাসের ওপর জোর দিয়ে ছন্দের নানা পরীক্ষা করেন। তিনি সংস্কৃত ছন্দ, যেমন মন্দাক্রান্তা, বাংলা ভাষায় সফলভাবে প্রয়োগ করেন।

৪.৫. আধুনিক ও উত্তরাধুনিক পর্ব (বিংশ শতকের ত্রিশের দশক থেকে বর্তমান)

এই পর্বে কবিতার প্রধান বাহন হয়ে ওঠে মুক্তছন্দ বা গদ্যছন্দ। জীবনানন্দ দাশ, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, বুদ্ধদেব বসু, অমিয় চক্রবর্তী, বিষ্ণু দে প্রমুখ কবিরা এর প্রধান রূপকার।

  • মুক্তছন্দের প্রাধান্য: এই সময়ের কবিরা অক্ষরবৃত্তের চালকে ভিত্তি করে গদ্যের স্বাভাবিক ভঙ্গিতে কবিতা রচনা শুরু করেন। এতে পর্বের দৈর্ঘ্য নির্দিষ্ট থাকে না এবং চরণের শেষে মিল প্রায়ই বর্জিত হয়। কবিতার ভাব ও আবেগ অনুযায়ী ছন্দ প্রবাহিত হয়।
  • ছন্দের সচেতন ব্যবহার: যদিও মুক্তছন্দই প্রধান ধারা, তবুও স্বরবৃত্ত ও মাত্রাবৃত্তের ব্যবহারও আধুনিক কবিতায় লক্ষ্য করা যায়। শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ, শক্তি চট্টোপাধ্যায় প্রমুখ কবিরা তিন প্রকার ছন্দেই সফলভাবে কবিতা লিখেছেন।
  • পরীক্ষা-নিরীক্ষা: উত্তরাধুনিক পর্বে ছন্দের প্রতিষ্ঠিত কাঠামো নিয়েও ভাঙচুরের চেষ্টা দেখা যায়। কবিতার আঙ্গিক ও ভাষাগত পরীক্ষা-নিরীক্ষা বর্তমানেও চলমান।

৫. অলংকার পরিচিতি

অলংকার মূলত কাব্যভাষার সৌন্দর্যবর্ধক উপাদান। এর প্রধান দুটি শ্রেণি হলো:

শ্রেণিবর্ণনাউদাহরণ
শব্দালংকারযে অলংকার শব্দের ধ্বনি বা রূপের ওপর নির্ভর করে কাব্যের সৌন্দর্য সৃষ্টি করে। এতে শব্দের পরিবর্তে তার সমার্থক শব্দ বসালে অলংকারটি নষ্ট হয়ে যায়।অনুপ্রাস (Alliteration): একই ধ্বনি বা ধ্বনিগুচ্ছের পুনরাবৃত্তি। যেমন: “গুরু গুরু মেঘ গুমরি গুমরি গরজে গগনে গগনে।”
অর্থালংকারযে অলংকার শব্দের অর্থের ওপর নির্ভর করে সৌন্দর্য সৃষ্টি করে। এতে শব্দের পরিবর্তে সমার্থক শব্দ ব্যবহার করলেও অলংকারটি বজায় থাকে।উপমা (Simile): দুটি ভিন্ন বস্তুর মধ্যে কোনো সাধারণ গুণের ভিত্তিতে তুলনা। যেমন: “ভ্রমরকৃষ্ণ চোখ।” <br> রূপক (Metaphor): উপমান ও উপমেয়ের মধ্যে অভেদ কল্পনা। যেমন: “বিষাদ-সিন্ধু।”

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *