বাংলা নাটকের আদিপর্ব

বাংলা নাটকের আদিপর্ব

আধুনিক বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে নাটকের আদিপর্ব একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। উনবিংশ শতকের চতুর্থ-পঞ্চম দশকে, যখন বাংলা গদ্য এবং কাব্যের পুনর্জাগরণ ঘটছিল, তখন নাট্যসাহিত্যও তার প্রথম পদক্ষেপ নেয়। এই পর্বকে ‘অনুবাদ-যুগ’ বলা যায়, কারণ সংস্কৃত এবং ইংরেজি নাটকের অনুবাদ এবং অভিযোজনের মাধ্যমেই বাংলা নাটকের ভিত্তি গড়ে ওঠে। প্রথম মৌলিক নাটকগুলি পাশ্চাত্য নাট্যধারার প্রভাবে গঠিত হলেও, সংস্কৃত ঐহিত্যের ছাপ এড়াতে পারেনি। এই পর্বের প্রধান নাট্যকাররা—যোগেন্দ্রচন্দ্র গুপ্ত, তারাচরণ শিকদার এবং হরচন্দ্র ঘোষ—বাংলা নাট্যসাহিত্যের পথিকৃৎ। তাঁদের রচনায় ইংরেজি নাট্যপ্রথার প্রভাব (যেমন অঙ্ক-বিভাগ, দৃশ্য-বিভাজন) স্পষ্ট, যা পরবর্তীকালে দীনবন্ধু মিত্র, গিরিশচন্দ্র ঘোষ প্রমুখকে অনুপ্রাণিত করে।

প্রেক্ষাপট: নাট্যসাহিত্যের অভাব এবং উদ্ভাবন

উনবিংশ শতকের প্রথমার্ধে বাংলায় নাটকের অভাব ছিল মর্মান্তিক। যাত্রা, পাচালি এবং স্থলপাঠের মতো লোকনাট্যের প্রভাব থাকলেও, মঞ্চভিত্তিক নাটকের কোনো ঐতিহ্য গড়ে ওঠেনি। ইংরেজি শিক্ষার প্রসার এবং শেক্সপিয়রের মতো ইংরেজি নাটকের প্রভাবে কিছু বুদ্ধিজীবী নাট্যরচনায় হাত দেন। প্রথমে সংস্কৃত নাটকের অনুবাদ হয় (যেমন কালিদাসের ‘শাকুন্তলা’), কিন্তু শীঘ্রই মৌলিক রচনার চেষ্টা শুরু হয়। এই পর্বের নাটকগুলি মূলত পৌরাণিক বা ঐতিহাসিক কাহিনীভিত্তিক, যাতে যুক্তিবাদী সমাজের প্রতিফলন কম এবং কবিত্বময়তা বেশি। নাট্যকাররা ইংরেজি ‘অ্যাক্ট’ এবং ‘সিন’-এর ধারণা গ্রহণ করেন, কিন্তু সংস্কৃতের ‘নান্দী’, ‘সূত্রধার’ এবং ‘বিদূষক’-এর মতো উপাদান রাখতে পারেননি পুরোপুরি। ফলে, এই নাটকগুলি মঞ্চায়িত হয়নি বেশিরভাগ ক্ষেত্রে, কিন্তু সাহিত্যিক মূল্যে তা মাইলফলক।

যোগেন্দ্রচন্দ্র গুপ্ত: প্রথম মৌলিক নাটকের পথিকৃৎ

বাংলা নাট্যসাহিত্যের প্রথম মৌলিক নাটক ‘কীর্তিবিলাস’ (১৮৫২) যোগেন্দ্রচন্দ্র গুপ্তের রচনা। এটি ইংরেজি ধারণের প্রথম রোমান্টিক ট্র্যাজেডি (বিয়োগান্ত নাটক), যা শেক্সপিয়রের প্রভাবে গঠিত। কাহিনী সপত্নীপুত্রবিদ্বেষ এবং তার নিষ্ঠুর পরিণতির উপর ভিত্তি করে, যা সংস্কৃত নাট্যশাস্ত্রের ‘বিয়োগান্ত নিষিদ্ধ’ বিধানকে চ্যালেঞ্জ করে। গ্রন্থের ভূমিকায় লেখক নিজেই কৈফিয়ত দেন: ধার্মিক ব্যক্তির দুঃখান্ত কাহিনী লেখায় পণ্ডিতদের ভ্রান্তি দূর করতে চান। তিনি লিখেছেন, “জীবনধারণ করিলেই ইষ্ট-অনিষ্ট উভয়ের ভোগা হইতে হইবে।”

‘কীর্তিবিলাস’-এ ট্র্যাজেডির আনন্দজনকতা নিয়ে আলোচনা আছে: শোকজনক ঘটনা দেখলে মনে সুখোদয় হয়, যেমন শেক্সপিয়রের উদাহরণ দিয়ে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। নাটকটি পাঁচ অঙ্কে বিভক্ত, কিন্তু ভাষায় সংস্কৃত প্রভাব লক্ষণীয়—গদ্যের সঙ্গে পদ্য, যমক-অনুপ্রাসের ব্যবহার। কাহিনী এতিহাসিক, কিন্তু ঘটনার রাজি-কারণহীনতায় খাঁটি কারুণ্য ফুটে ওঠেনি। তবু, এটি বাংলা নাট্যসাহিত্যের ইতিহাসে স্মরণীয়, কারণ এতে ইংরেজি নাট্যপ্রথার প্রবেশ ঘটে।

তারাচরণ শিকদার: ইংরেজি আদর্শের প্রথম পৌরাণিক নাটক

তারাচরণ শিকদারের ‘ভদ্রাজুন’ (১৮৫২) বাংলা নাটকের আদিপর্বের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ। এটি অজুন-সুভদ্রার বিবাহকাহিনী নিয়ে, মহাভারত থেকে সংগৃহীত। লেখক ইংরেজি নাট্যপ্রথা অনুসরণ করে পাঁচ অঙ্কে বিভক্ত করেন, যেখানে ‘দৃশ্য’-এর স্থলে ‘সিন’ ব্যবহার। সংস্কৃতের বিদূষক, নান্দী এবং প্রস্তাবনা পরিত্যাগ করা হয়েছে, যা নাটককে আধুনিক করে তোলে। ভূমিকায় লেখক বলেন, দেশীয় নাটকগুলি রঙ্গভূমিতে অভিনীত হয় না কারণ সেগুলি গান-ভরা এবং ভগ্নাবশেষপূর্ণ। তাই তিনি মহাভারতের আদিপর্ব থেকে কাহিনী সংকলন করে নাটক রচনা করেন।

নাটকটি গদ্য-পদ্য মিশ্রিত, সংলাপে গান যোগ করা হয়েছে। প্রারম্ভে ‘আভাস’ নামে একটি ভূমিকা আছে, যা লেখকের নিজস্ব বর্ণনা। ইংরেজি আদর্শের প্রভাব স্পষ্ট, কিন্তু সংস্কৃতের ছোঁয়া রয়েছে—যেমন পয়ার-ছন্দের ব্যবহার। কাহিনী সংহত হলেও, চরিত্রগুলির নাট্যিক বিকাশ ঘটেনি; এটি মূলত আখ্যানময়। তবু, বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতা এবং সরল ভাষা এর সজীবতা যোগ করে। বাঙালি সমাজের চেনা পরিবেশের ছোঁয়া এতে অভিনবতা এনেছে। এই নাটকটি প্রথম অভিনব পদ্ধতিতে গঠিত পৌরাণিক নাটক হিসেবে স্মরণীয়।

হরচন্দ্র ঘোষ: অনুবাদ এবং মৌলিকতার সমন্বয়

হরচন্দ্র ঘোষ (১৮১৭-১৮৮৪) এই পর্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নাট্যকার। তাঁর প্রথম নাটক ‘ভাল্গমতী-চিন্তাবিলাস’ (১৮৫৩) শেক্সপিয়রের ‘মার্চেন্ট অফ ভেনিস’-এর অনুবাদ। এটি পাঁচ অঙ্কে বিভক্ত, ‘অ্যাক্ট’-এর ধারণা গ্রহণ করা হয়েছে। পরবর্তীকালে ‘চারু গুখ-চিন্তাহর’ (১৮৬৪) ‘রোমিও অ্যান্ড জুলিয়েট’-এর অনুবাদ। হরচন্দ্রের অনুবাদে শেক্সপিয়রের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা লক্ষণীয়, কিন্তু সংস্কৃত প্রভাব (নান্দী, সূত্রধার, পয়ার-ছন্দ) এড়াতে পারেননি। ভাষা কৃত্রিম এবং দীর্ঘ, যা শেক্সপিয়রের সরলতার সঙ্গে মেলে না। ফলে, অনুবাদগুলি শোচনীয় বলে মনে হয়, কারণ লেখকের কবিশক্তি এবং চরিত্র-অভিজ্ঞতা অপর্যাপ্ত ছিল।

হরচন্দ্রের মৌলিক নাটক ‘কৌরববিয়োগ’ (১৮৫৮) মহাভারত থেকে নেওয়া, কিন্তু নীতিজ্ঞানের উদ্দেশ্যে রচিত। এতে আদর্শকথা পরিহার করা হয়েছে যাতে ছাত্রদের পাঠের যোগ্য হয়। গান এবং পদ্যের ব্যবহার আছে, কিন্তু সংস্কৃতপ্রভাব ভাষাকে গুরুগম্ভীর করে তুলেছে। চরিত্রগুলি জীবন্ত হয়নি, কিন্তু নাট্যকারের সাহিত্যিক দখল এতে ফুটে উঠেছে। হরচন্দ্রের অবদান অনুবাদের মাধ্যমে ইংরেজি নাট্যধারা প্রবর্তন।

বাংলা নাটকের আদিপর্বে মৌলিকতার চেষ্টা থাকলেও, শিল্পসৌন্দর্যের অভাব, ভাষার কৃত্রিমতা এবং মঞ্চায়নের অভাব এর সীমাবদ্ধতা। তবু, এই পর্ব ইংরেজি নাট্যপ্রথার দ্বার উন্মোচন করে এবং পরবর্তী নাট্যকারদের (যেমন কালীপ্রসন্দ সিংহ, দীনবন্ধু মিত্র) পথ প্রশস্ত করে। যোগেন্দ্রচন্দ্র, তারাচরণ এবং হরচন্দ্রের মতো পথিকৃৎদের কৃতিত্ব অমলিন, কারণ তাঁরা বাংলা নাট্যসাহিত্যকে একটি নতুন দিগন্ত দেন। এই পর্ব আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, সাহিত্যের বিকাশ একটি ধীরগতির যাত্রা, যাতে ঐতিহ্য এবং আধুনিকতার সমন্বয়ই চাবিকাঠি।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *