ভাষাবিজ্ঞানের ক্রমবিকাশ
ভাষাবিজ্ঞান (Linguistics) একটি বৈজ্ঞানিক শাখা যা ভাষার গঠন, বিকাশ, ব্যবহার এবং সমাজগত প্রভাব নিয়ে আলোচনা করে। এর ক্রমবিকাশ হাজার বছরের ইতিহাসবাহী, যা প্রাচীন ভারতীয় ও পাশ্চাত্য ঐতিহ্য থেকে শুরু করে আধুনিক কাঠামোগত ও সৃজনশীল (Generative) তত্ত্ব পর্যন্ত বিস্তৃত। নিম্নে এর প্রধান ধাপগুলি সংক্ষেপে বর্ণিত হলো, যা প্রধানত পাশ্চাত্য ধারা (Western Tradition) এবং ভারতীয় ঐতিহ্যের উপর ভিত্তি করে। এই আলোচনা দুটি গ্রন্থ—সুলোচনা ভট্টাচার্যের ভাষার তত্ত্ব ও বাংলা ভাষা (২০১২) এবং ড. রামেশ্বর শ’-এর সাধারণ ভাষাবিজ্ঞান ও বাংলা ভাষা (চতুর্থ সংস্করণ, ২০১২)—এর ভিত্তিতে সংগৃহীত।
১. প্রাচীন যুগ (Ancient Period: খ্রিস্টপূর্ব ৪র্থ শতাব্দী থেকে খ্রিস্টীয় ৫ম শতাব্দী)
ভাষাবিজ্ঞানের উৎপত্তি হয় প্রাচীন ভারতে এবং গ্রীস-রোমে। এখানে ভাষা-বিশ্লেষণ মূলত ব্যাকরণকেন্দ্রিক ছিল।
- ভারতীয় ঐতিহ্য: সংস্কৃত ভাষার ব্যাকরণ-বিজ্ঞানের শীর্ষস্থানীয় উদাহরণ। পাণিনির অষ্টাধ্যায়ী (খ্রিস্টপূর্ব ৪র্থ শতাব্দী) ভাষার শব্দ-গঠন, ধ্বনি-বিন্যাস এবং বাক্য-কাঠামোর নিয়মাবলী প্রতিষ্ঠা করে। পতঞ্জলির মহাভাষ্য (খ্রিস্টপূর্ব ২য় শতাব্দী) এবং ভর্তৃহরির কাজ এটিকে আরও সমৃদ্ধ করে। এখানে ভাষা ‘স্বাভাবিক’ (natural) এবং ‘নৈমিত্তিক’ (conventional) উভয় দিক নিয়ে আলোচনা হয়।
- গ্রীক-রোমান ঐতিহ্য: প্লেটোর ক্র্যাটিলাস (খ্রিস্টপূর্ব ৪র্থ শতাব্দী) ভাষার উৎপত্তি নিয়ে দার্শনিক আলোচনা শুরু করে—শব্দ কি প্রকৃতি-নির্ধারিত (physis) নাকি সমাজ-নির্ধারিত (nomos)? অ্যারিস্টটল ধ্বনি ও অর্থের সম্পর্ক বিশ্লেষণ করেন। স্তোইক দার্শনিকরা (Stoics) ব্যাকরণের প্রথম তত্ত্ব প্রণয়ন করেন। রোমান যুগে প্রিসিয়ানের ইনস্টিটিউশনেস গ্রাম্যাটিক্যা (৫ম শতাব্দী) ল্যাটিন ব্যাকরণের ভিত্তি স্থাপন করে।
২. মধ্যযুগ (Medieval Period: ৫ম থেকে ১৫শ শতাব্দী)
এ যুগে ভাষাবিজ্ঞান ধর্মীয় ও দার্শনিক প্রভাবে আবদ্ধ ছিল। ইউরোপে ‘মোডিস্টিক স্কুল’ (Modistic School) উদ্ভূত হয়, যা ভাষাকে যুক্তি (logic) এর সাথে যুক্ত করে—শব্দের ‘মোড’ (mode) নিয়ে আলোচনা। ভারতে এ সময় ন্যায়-ব্যাকরণ (Naiyayika Grammar) বিকশিত হয়, যেমন ভাট্টোইজধীকৃতের কাজ।
৩. পুনর্জাগরণ ও প্রারম্ভিক আধুনিক যুগ (Renaissance to Early Modern: ১৫শ থেকে ১৮শ শতাব্দী)
পুনর্জাগরণে ক্লাসিক্যাল ভাষা (গ্রীক, ল্যাটিন) পুনরুদ্ধারের সাথে তুলনামূলক অধ্যয়ন শুরু হয়। ড্যানিয়েল জোন্স (১৬শ শতাব্দী) ইংরেজি ব্যাকরণ লেখেন। ১৮শ শতাব্দীতে জোহান হারবার্টের ইউনিভার্সাল এটিওলজি অফ আফ্রিকা (১৭২০) ভাষার উৎপত্তি নিয়ে অনুমান করে। ভারতে এ সময় বাংলা, হিন্দি ইত্যাদির প্রথম গ্রামার লেখা হয়।
৪. ১৯শ শতাব্দী: তুলনামূলক ভাষাবিজ্ঞানের যুগ (Comparative Linguistics)
এটি ভাষাবিজ্ঞানকে বৈজ্ঞানিক করে তোলে। উইলিয়াম জোন্স (১৭৮৬) সংস্কৃত, গ্রীক, ল্যাটিনের সাদৃশ্য দেখে ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষা-পরিবার প্রস্তাব করেন। ফ্রানৎজ বপ (১৮১৬) কম্পারেটিভ গ্রামার অফ সংস্কৃত, জার্মান, গ্রীক অ্যান্ড ল্যাটিন লেখেন। জ্যাকব গ্রিম (১৮২২) ‘গ্রিমের আইন’ (Grimm’s Law) প্রণয়ন করে শব্দ-পরিবর্তনের নিয়ম স্থাপন করেন। এ যুগে ভাষা-পরিবারের শ্রেণীবিভাগ (e.g., ইন্দো-ইউরোপীয়, সিনো-টিবেটান) হয়।
৫. ২০শ শতাব্দী: কাঠামোগত ও বর্ণনামূলক ভাষাবিজ্ঞান (Structural & Descriptive Linguistics)
- ফার্দিনান্দ দ্য সস্যুর (১৯১৬, কোর্স ইন জেনারেল লিঙ্গুইস্টিক্স) ভাষাকে ‘সিস্টেম’ হিসেবে দেখেন—’ল্যাঙ্গ’ (langue: সামাজিক কাঠামো) বনাম ‘প্যারোল’ (parole: ব্যক্তিগত ব্যবহার)। এটি কাঠামোগতত্ববাদের (Structuralism) ভিত্তি।
- লিওনার্ড ব্লুমফিল্ড (১৯৩৩, ল্যাঙ্গুয়েজ) বর্ণনামূলক পদ্ধতি (Descriptive Method) প্রচলন করেন, যা ভাষার বর্তমান অবস্থা অবজ্ঞাতভাবে বিশ্লেষণ করে।
- অন্যান্য: এ. মার্টিনেটের ফাঙ্কশনালিজম, জে. আর. ফার্থের প্রাগমাটিক্স।
৬. সমকালীন যুগ: সৃজনশীল ব্যাকরণ ও আন্তঃশাখাগততা (Generative Grammar & Interdisciplinary)
- নোম চমস্কি (১৯৫৭, সিনট্যাক্সটিক স্ট্রাকচার্স) সৃজনশীল ব্যাকরণ (Generative Grammar) প্রবর্তন করেন—ভাষা মানুষের জন্মগত ক্ষমতা (Universal Grammar) থেকে উদ্ভূত। পরে ট্রান্সফরমেশনাল জেনারেটিভ গ্রামার (TGG) বিকশিত হয়।
- আধুনিক শাখা: সমাজভাষাবিজ্ঞান (Sociolinguistics, উইলিয়াম ল্যাবভ), মনো-ভাষাবিজ্ঞান (Psycholinguistics), কম্পিউটেশনাল লিঙ্গুইস্টিক্স (AI-সম্পর্কিত)।
- ভারতীয় প্রেক্ষাপটে: বাংলা ভাষার ঐতিহাসিক ব্যাকরণ (e.g., সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের কাজ) এবং আধুনিক গবেষণা (CIIL, Mysore)।
ক্রমবিকাশের টাইমলাইন (Timeline)
| যুগ | প্রধান ঘটনা/ব্যক্তিত্ব | অবদান |
|---|---|---|
| প্রাচীন (খ্রিস্টপূর্ব ৪র্থ শতাব্দী) | পাণিনি, প্লেটো, অ্যারিস্টটল | ব্যাকরণের নিয়মাবলী, উৎপত্তি-তত্ত্ব |
| মধ্যযুগ (৫ম-১৫শ শতাব্দী) | মোডিস্টিক স্কুল, ন্যায়-ব্যাকরণ | যুক্তি-ভিত্তিক বিশ্লেষণ |
| পুনর্জাগরণ (১৫শ-১৮শ শতাব্দী) | ড্যানিয়েল জোন্স, জোহান হারবার্ট | তুলনামূলক অধ্যয়ন শুরু |
| ১৯শ শতাব্দী | উ. জোন্স, গ্রিম, বপ | ভাষা-পরিবারের শ্রেণীবিভাগ |
| ২০শ শতাব্দী (প্রথমার্ধ) | সস্যুর, ব্লুমফিল্ড | কাঠামোগত ও বর্ণনামূলক পদ্ধতি |
| ২০শ-২১শ শতাব্দী | চমস্কি, ল্যাবভ | সৃজনশীলতা, সমাজগত বিশ্লেষণ |
এই ক্রমবিকাশ ভাষাকে শুধু ব্যাকরণের সীমায় আবদ্ধ না রেখে, এটিকে মানব-বিজ্ঞানের একটি অঙ্গ করে তুলেছে। আরও বিস্তারিত জানতে উল্লিখিত গ্রন্থগুলির অধ্যায় ৭ (দ্বিতীয় গ্রন্থ) বা অধ্যায় ৬ (প্রথম গ্রন্থ) পড়ুন।
⭐ RBI Office Attendant Recruitment 2026 – Apply Online for 572 Posts
⭐ RBI Office Attendant Recruitment 2026 – Apply Online for 572 Posts The Reserve Bank…
Bihar BSSC Inter Level Recruitment 2025–2026: Apply Online for 23,175+ Government Jobs
Bihar BSSC Inter Level Recruitment 2025–2026: Apply Online for 23,175+ Government Jobs The Bihar Staff…
📢 BTSC Junior Engineer Recruitment 2026 – Apply Online for 2809 Posts
📢 BTSC Junior Engineer Recruitment 2026 – Apply Online for 2809 Posts The Bihar Technical…
📢 Assam Police Forest Guard Recruitment 2026 – Apply Online for 2,972 Vacancies
📢 Assam Police Forest Guard Recruitment 2026 – Apply Online for 2,972 Vacancies The State…
বাক্যতত্ত্ব (Syntax)
বাক্যতত্ত্ব (Syntax) বাক্যতত্ত্ব ভাষার বৃহত্তর একক—বাক্যের গঠন, তার উপাদানসমূহের বিন্যাস, সম্পর্ক এবং বিভিন্ন ধরনের নিয়মাবলী…
রূপতত্ত্ব (Morphology)
রূপতত্ত্ব (Morphology) ভাষাবিজ্ঞানের ধ্বনিতত্ত্বের পরবর্তী অধ্যায় রূপতত্ত্ব, যা ভাষার শব্দগঠন, রূপবৈচিত্র্য এবং ব্যাকরণিক সংবর্ধন (grammatical…
