বাংলা বানানবিধি ও লিপির ইতিহাস: একটি বিস্তারিত বর্ণনা

বাংলা বানানবিধি ও লিপির ইতিহাস: একটি বিস্তারিত বর্ণনা

বাংলা ভাষা, ভারতীয় উপমহাদেশের অন্যতম প্রধান ভাষা হিসেবে, তার সমৃদ্ধ সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের পাশাপাশি একটি দীর্ঘ ও জটিল বানানবিধি ও লিপির ইতিহাস নিয়ে গড়ে উঠেছে। এই নিবন্ধে আমরা বাংলা বানানবিধির বিকাশক্রম এবং লিপির উদ্ভব-পরিণতির বিস্তারিত বর্ণনা করব, যা প্রাচীনকাল থেকে আধুনিক যুগ পর্যন্ত বিস্তৃত। এই ইতিহাস শুধুমাত্র ভাষাগত নিয়মের বিকাশ নয়, বরং সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক প্রভাবের এক জীবন্ত দলিল। বর্তমান পরিমর্জিত বাংলা একাডেমি বানানবিধি এই দীর্ঘ যাত্রার একটি পরিপূর্ণ ফলশ্রুতি।

বাংলা বানানবিধির ইতিহাস: প্রাথমিক উদ্ভব থেকে আধুনিক সংস্কার

বাংলা বানানবিধির ইতিহাস প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় বাংলা পুরাতন যেসব বাংলা ভাষা ব্যবহারের সঙ্গে জড়িত। প্রথমদিকে বাংলা ভাষার ব্যবহারে কোনো নির্দিষ্ট বানানবিধি ছিল না; এটি ছিল একটি রূপান্তরিত রূপ যা স্থানীয় প্রভাবে গড়ে উঠত। কিন্তু ঔপনিবেশিক যুগে ইউরোপীয়দের আগমনের সঙ্গে বাংলা বানানবিধির প্রথম সুনির্দিষ্ট চেষ্টা শুরু হয়।

১৭৪৩ খ্রিস্টাব্দে প্রথমবারের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ প্রকাশিত হয়: Vocabulario em idioms Bengala e Portuguez, dividido em duas partes। এটি একটি পর্তুগিজ-বাংলা অভিধান, যার প্রথম অংশে পর্তুগিজ থেকে বাংলায় এবং দ্বিতীয় অংশে বাংলা থেকে পর্তুগিজে শব্দানুবাদ ছিল। এই গ্রন্থে স্বরবর্ণসহ বাংলা বানানের প্রথম নমুনা পাওয়া যায়, যা তৎকালীন বাংলা বানানের একটি প্রাথমিক ছবি তুলে ধরে।

১৭৭৮ খ্রিস্টাব্দে ন্যাথানিয়েল ব্রায়ারের A Grammar of the Bengal Language গ্রন্থে বাংলা বর্ণমালার মূল রূপ ব্যবহৃত হয়। এই গ্রন্থে উইলিয়াম কারসনের নির্দেশে বাংলা অক্ষরের চার্ট তৈরি করেন পঞ্চানন কর্মকার। এই চার্টে বাংলা ভাষায় যেসব পুরাতন অক্ষর ব্যবহৃত হতো, তা তুলে ধরা হয়।

উনিশ শতকের শুরুতে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান অপরিসীম। তাঁর বর্ণপরিচয় (প্রথম খণ্ড) ১৮৫৫ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত হয় এবং ১৮৭৫ সালে ৬০তম সংস্করণ প্রকাশিত হয়। বিদ্যাসাগর বাংলা বর্ণমালাকে সংস্কৃতানুপ্রাণিত করে যত্নশীলভাবে সংশোধন করেন। তাঁর বর্ণমালায়:

  • ঋ ও ৠ অক্ষর বর্জিত হয়।
  • য, ড়, ঢ এই তিনটি বর্ণের স্বীকৃতি দেওয়া হয়।
  • সংস্কৃতের খণ্ড ত (ৎ) অক্ষর যদিও অপ্রচলিত, তবু ‘ৎ’ ও ‘ত’ এর পার্থক্যের কারণে ‘ৎ’-কে বাংলা বর্ণমালায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
  • অনুস্বার ও বিসর্গ স্বরধ্বনি হিসেবে ব্যঞ্জনবর্ণের তালিকায় স্থান পায়।
  • অনুনাসিক স্বরের স্বধ্বনি রচনাত্মক হয়, যা চন্দ্রবিন্দু ব্যঞ্জনবর্ণের তালিকায় স্থান পায়।

বিদ্যাসাগরের পূর্বে রামমোহন রায়ের (১৮৩৩) গ্রন্থে ঔড়িয়া ভাষায় ১৬টি স্বরবর্ণ ও ৩৪টি ব্যঞ্জনবর্ণের উল্লেখ আছে, যাতে য়, ড়, ঢ, ণ, য, ব, ষ, ঋ, ৠ, ৯, ৬১, অং, অঃ এই অক্ষরগুলো সংস্কৃত পদের জন্য ব্যবহৃত হতো।

প্রচলিত বর্ণমালা: তুলনামূলক চার্ট

স্বরবর্ণ (প্রচলিত)ব্যঞ্জনবর্ণ
অ, আ, ই, ঈ, উ, ঊ, ঋ, ৠ, ৠ, ৬১, এ, ঐ, ও, ঔ, অং (অনুস্বার), অঃ (বিসর্গ)ক, খ, গ, ঘ, ঙ, চ, ছ, জ, ঝ, ঞ, ট, ঠ, ড, ঢ, ণ, ত, থ, দ, ধ, ন, প, ফ, ব, ভ, ম, য, র, ল, ব, শ, ষ, স, হ, ক্ষ
স্বরবর্ণ (বিদ্যাসাগরীয়)ব্যঞ্জনবর্ণ
অ, আ, ই, ঈ, উ, ঊ, ঋ, ৠ, এ, ঐ, ও, ঔক, খ, গ, ঘ, ঙ, চ, ছ, জ, ঝ, ঞ, ট, ঠ, ড, ঢ, ণ, ত, থ, দ, ধ, ন, প, ফ, ব, ভ, ম, য, র, ল, ব, শ, ষ, হ, ড়, ঢ়, য, ৎ, ং, ঃ, ংাঁ

১৮৭৭ সালে ক্যালকাটা রিভিউ পত্রিকায় উত্তরপাড়া স্কুলের প্রিন্সিপাল জেমস লং-এর লেখা Bengali Spoken and Written প্রকাশিত হয়, যা বাংলা বানান সংস্কারের উৎস হিসেবে বিবেচিত। এটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দীর্ঘকালীন বাংলা ব্যাকরণ রচনারও উদ্দীপক।

১৮৭৮ সালে (বঙ্গাব্দ ১২৮৫) বিম্বচন্দ্র বিদ্যাবাগীশের বঙ্গভাষা অরিজিন নামক প্রবন্ধে বাংলা বর্ণমালা সংস্কারের প্রস্তাব করা হয়। এতে স্বরবর্ণের রূপ যেমন অ, আ, রঅ, অী, অু, অূ, অৃ, যঅ, তঅ, যঐ, যঔ; যুক্তব্যঞ্জন যেমন বুদ্ধি (‘বুরি’-র বদলে); পঞ্চম বর্ণস্থানের (ঙ, ঞ, ণ, ন, ম) চন্দ্রবিন্দু বাদ দেওয়া (যেমন অঞ্চল > অঞ্চল, নেধ্যা > নেধ্যা); রেফ বর্জন (কর্ম্চ > কম্চ) প্রস্তাবিত হয়।

১৮৯১ সালে বিদ্যাসাগরের মৃত্যুর পর তাঁর কাজের পত্রিকায় অ-তৎসম শব্দের একটি তালিকা পাওয়া যায়, যা ১৯০৮ সালে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। এতে বাংলা অতত্ত্ব শব্দের বানানের নিয়ম দেখা যায়, যেমন বাড়ি, পাড়ি, পাড়ি, পার্খ, বাঙ্গাল, পিয়ার, কার্হন, চিকারি, পোশুরড়, ঘিরন ইত্যাদি।

১৯১৪ সালে প্রমথ চৌধুরী সম্পাদনায় সবুজপত্র-এ সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের বাংলা বানানবিধি তত্ত্ব প্রকাশিত হয়। ১৯২৪ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অনুপ্রেরণায় প্রণত্তচন্দ্র মহলানবিশী ও সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় একটি চেষ্টামূলক বানানবিধি তৈরি করেন, যা ১৯২৫ সালে সদ্বিম্ব মাসিক-এ ‘চলিত ভাষার বানান’ নামে প্রকাশিত হয়। এতে লুপ্তরূপ ও হস্তলিপির অর্থায়ন; ও-কারের বাহুল্য (বললা, যাদবা, আদিলা, রিলা); উচ্চারণ অনুসারে বানান (যেমন ঐ-কার অই-তে); অন্তর্গত স্বরাণ্ত ব্যঞ্জনের বাদ; ‘রক’ ও ‘কী’-র পার্থক্য; ‘অয়া’ ধ্বনির জন্য নতুন অক্ষর প্রস্তাবিত হয়। এটি ব্যবহারিক হলেও সম্পূর্ণ গ্রহণযোগ্যতা পায়নি।

১৯৩০ সালে নাজেমখাঁ বুখারির আধুনিক বঙ্গভাষার অরিজিন প্রকাশিত হয়। ১৯৩৫ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় বাংলা বানানবিধি নিয়মাবলি কমিটি গঠন করে, যা ১৯৩৬ সালে একটি পুস্তক প্রকাশ করে। এতে নাজেমখাঁ বুখারি, চারুচন্দ্র বসু ইত্যাদি সদস্য ছিলেন। উদ্দেশ্য ছিল সংস্কৃত-প্রভাবিত শব্দের বানান সংস্কার, কিন্তু অ-তৎসম শব্দের জন্য চেষ্টামূলক নিয়ম প্রস্তাবিত হয়। ১৯৭৯ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় দ্বিতীয় কমিটি গঠন করে, কিন্তু এটি অসম্পূর্ণ থেকে যায়।

বাংলাদেশে স্বাধীনতার পর ১৯৬৩ সালে বাংলা একাডেমি বানান সংস্কার কমিটি গঠন করে, যাতে ঙ, ংঃ, ঈ, ঈ-কার বাদ দেওয়া হয়। ১৯৬৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রেকর্ড অফিস কমিটি গঠিত হয়, যাতে ঈ, ঊ, ঐ, ঔ, ঙ, ঞ, ণ, ঈ-কার, ঊ-কার, ঐ-কার, ঔ-কার বর্জন; ব-ফলা ও য-ফলার পরিবর্তন; যুক্তবর্ণ উন্নয়ন; য-জ, চ-শ ব্যবহার নিয়ম; এ-কার ও ও-কার যেমন ব্যঞ্জনান্তে বাদ প্রস্তাবিত হয়।

১৯৯২ সালে বাংলা একাডেমি একাডেমি প্রণীত বাংলা বানান নিয়ম প্রকাশ করে, যা ১৯৯৮ ও ২০০০ সালে সংস্করণ হয়। এটি পরিমর্জিত বাংলা একাডেমি বানানবিধির সঙ্গে প্রায় অভিন্ন। ১৯৯১ সালে আনন্দবাজার পত্রিকা একটি বানানবিধি প্রণয়ন করে, যা নীলিমা চিব বিশীর সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়। ২০০৬ সালে প্রথম আলো একটি বানানবিধি প্রবর্তন করে।

পশ্চিমবঙ্গে ১৯৯৭ সালে পশ্চিমবঙ্গ বাংলা একাডেমি একাডেমি বানান অভিধান প্রকাশ করে, যার পাঁচটি সংস্করণ (১৯৯৭-২০০৫) হয়। এর উদ্দেশ্য বাংলা বানান মাতৃভাষা রক্ষা। সম্পাদক নীলিমা চিব বিশী, সঙ্খ ঘোষ ইত্যাদি।

এই সকল চেষ্টা বাংলা বানানকে আরও বৈজ্ঞানিক ও সহজবোধ্য করে তুলেছে, যদিও সম্পূর্ণ ঐক্য এখনও অর্জিত হয়নি।

বাংলা লিপির ইতিহাস: প্রাচীন উৎস থেকে আধুনিক রূপ

মানুষের প্রথম প্রয়াস ছিল বস্তুগত (concrete) বস্তুর চিত্রায়ন, কিন্তু অমূর্ত (abstract) ধারণার জন্য ব্যঞ্জনবর্ণের প্রয়োজন হয়। বিশ্বের অধিকাংশ লিপি প্রোটো-সিনাইটিক লিপি থেকে উদ্ভূত, যা গ্রীক লিপির স্বরবর্ণের উৎস। কিন্তু বাংলা লিপি স্বতন্ত্র, যা ইন্দো-ইউরোপীয় বর্ণমালা থেকে উদ্ভূত।

বাংলা লিপির দীর্ঘ ইতিহাস দুটি প্রধান লিপি থেকে: ব্রাহ্মী ও খরোষ্ট্রী। খরোষ্ট্রী ইরানীয় লিপি থেকে উদ্ভূত, যা মধ্যপ্রাচ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। কুষাণ যুগে এটি বাংলায় প্রবেশ করে, কিন্তু স্থায়ী হয়নি। বাংলায় প্রাপ্ত কুষাণ মুদ্রায় খরোষ্ট্রী লিপি দেখা যায়।

ব্রাহ্মী লিপি বাংলা লিপির মূল উৎস। এর উৎপত্তি রহস্যজনক, সম্ভবত ইন্দু সভ্যতা থেকে। নামকরণ ‘ব্রাহ্মী’ ব্রহ্মা বা ব্রাহ্মণদের সঙ্গে যুক্ত। প্রাচীনতম নিদর্শন যমপল্লী শিলালিপি (রি.পূ. ৪৮৭)। অশোক যুগে এটি ব্যাপক প্রচলিত হয়, যা উত্তরীয় ও দক্ষিণীয় শাখায় বিভক্ত। বাংলা লিপি উত্তরীয় ব্রাহ্মী (Northern Class) থেকে উদ্ভূত, বিশেষ করে পূর্বীয় শাখা।

মহাস্থানী রেলিয়েফ ও অন্যান্য স্থানে প্রাপ্ত ব্রাহ্মী লিপি মৌর্য যুগীয়। শুঙ্গ, ক্ষত্রপ, কুষাণ যুগে এটি পরিবর্তিত হয়: অক্ষরগুলো কৌণিক (angular) থেকে বাঁকা (cursive) হয়। গুপ্ত যুগে (পঞ্চম শতাব্দী) বাংলা লিপির গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ঘটে। গুপ্ত সম্রাটদের আমলে সংস্কৃত প্রমুখ ভাষা হয়, তাম্রপত্রে লিপি উৎকীর্ণ হয়। বাংলায় ৯টি তাম্রপত্রে গুপ্ত লিপি দেখা যায়।

গুপ্ত যুগে স্বরবর্ণের পরিবর্তন: ‘ই’ অক্ষর তিন বিন্দু থেকে দুই বিন্দুতে; ‘উ’ অক্ষর অনুভূমিক থেকে বাঁকা। ব্যঞ্জনবর্ণে ‘চ’ স্ফীত, ‘জ’ ত্রিভাজিত থেকে দ্বিভাজিত, ‘খ’-‘গ’-‘ঘ’-এ পদচিহ্ন (footmark) যোগ। এগুলো বাংলা অক্ষরের প্রোটো-রূপ।

গুপ্তোত্তর যুগে (ষষ্ঠ শতাব্দী) পাল ও সেন রাজাদের আমলে আরও পরিবর্তন: ‘অ’ অক্ষর বাঁকা হয়, ‘উ’ উপরের দিকে বাঁকা, ‘খ’ স্ফীত, ‘ল’-‘হ’ বাঁকা, ‘য’ দ্বিভাজিত। সপ্তম শতাব্দীতে কুর্টিল (bent) লিপি উদ্ভূত, যা খড়ি-পাতায় ব্যবহৃত। এতে অক্ষরগুলো তীক্ষ্ণ কৌণিক ও লেজওয়ালা। ‘ক’-‘ছ’ লুপযুক্ত হয়।

এই লিপির বিকাশ বাংলা ভাষাকে একটি স্বতন্ত্র পরিচয় দেয়েছে, যা আজও সংস্কৃত, প্রাকৃত ও স্থানীয় প্রভাবের মিশ্রণে সমৃদ্ধ। বর্তমান বাংলা লিপি এই দীর্ঘ ঐতিহ্যের ফসল, যা ডিজিটাল যুগেও অটুট।

বাংলা বানানবিধি ও লিপির ইতিহাস একটি অবিরাম সংগ্রামের গল্প—প্রাচীন ব্রাহ্মী থেকে আধুনিক একাডেমি নিয়ম পর্যন্ত। এটি শুধু ভাষার নয়, বাঙালির সাংস্কৃতিক পরিচয়েরও ইতিহাস। ভবিষ্যতে আরও সংস্কারের মাধ্যমে এটি আরও সহজ ও বিশ্বমানের হবে বলে আশা করা যায়।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *