চর্যাপদ: একটি বিশদ বিবরণ

চর্যাপদ: একটি বিশদ বিবরণ

চর্যাপদ হলো বাংলা ভাষার প্রাচীনতম সাহিত্যিক নিদর্শন এবং নব্য ভারতীয় আর্যভাষারও প্রাচীনতর রচনা। খ্রিস্টীয় অষ্টম থেকে দ্বাদশ শতাব্দীর মধ্যবর্তী সময়ে রচিত এই গীতিকবিতাগুলির রচয়িতারা ছিলেন সহজিয়া বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্যগণ। মূলত বৌদ্ধধর্মের গূঢ় সাধনতত্ত্বকে સાંকেতিক রূপকের আশ্রয়ে প্রকাশ করার উদ্দেশ্যে রচিত হলেও, এই পদগুলি তৎকালীন বাংলার সামাজিক ও প্রাকৃতিক জীবনের এক নিখুঁত প্রতিচ্ছবি ধারণ করে, যা এর সাহিত্যমূল্যকে অপরিসীম করেছে। ১৯০৭ সালে মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী নেপালের রাজদরবারের গ্রন্থাগার থেকে এর পাণ্ডুলিপি আবিষ্কার করেন এবং পরবর্তীতে আচার্য সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় ভাষাতাত্ত্বিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে এর সঙ্গে বাংলা ভাষার যোগসূত্র বৈজ্ঞানিকভাবে প্রতিষ্ঠা করেন। সন্ধ্যাভাষায় রচিত এই পদগুলির দ্বৈত অর্থ—একটি বাহ্যিক ও অন্যটি গূঢ় আধ্যাত্মিক—এর প্রধান বৈশিষ্ট্য। চর্যাপদ একাধারে ধর্মগ্রন্থ, কাব্যসংকলন, এবং হাজার বছর পূর্বের বাঙালি জীবনের এক প্রামাণ্য ঐতিহাসিক দলিল।

পরিচয় ও আবিষ্কার

চর্যাপদকে বাংলা সাহিত্যের আদি নিদর্শন হিসেবে গণ্য করা হয়। এই গীতিকবিতাগুলি সহজিয়া বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্যদের দ্বারা রচিত হয়েছিল, যা মূলত তাঁদের ধর্মীয় দর্শন, সাধনতত্ত্ব ও সাধনাপ্রণালী বিষয়ক।

হরপ্রসাদ শাস্ত্রী এই ধারণার বশবর্তী ছিলেন যে, বাংলায় মুসলমান আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পূর্বে ব্রাহ্মণ ও হিন্দু সমাজের পীড়নের আশঙ্কায় বৌদ্ধরা তাদের ধর্মীয় পুঁথিপত্র নিয়ে নেপাল, ভুটান ও তিব্বতে আশ্রয় নিয়েছিলেন। এই বিশ্বাস থেকে তিনি তিনবার নেপাল ভ্রমণ করেন। ১৮৯৭ ও ১৮৯৮ সালের প্রথম দুই বারে তিনি কিছু বৌদ্ধ ধর্মীয় পুঁথি সংগ্রহ করেন। অবশেষে, ১৯০৭ সালে তাঁর তৃতীয় নেপাল ভ্রমণকালে রাজদরবারের ‘অভিলিপিশালা’ বা গ্রন্থাগার থেকে তিনি চর্যাপদের একটি খণ্ডিত পুঁথি আবিষ্কার করেন, যার নাম ছিল ‘চর্যাচর্যবিনিশ্চয়’।

প্রকাশনা ও নামকরণ

আবিষ্কৃত পুঁথিটি হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর সম্পাদনায় আরও তিনটি পুঁথির (সরহপাদের দোহা, কৃষ্ণাচার্যের দোহা ও ডাকার্ণব) সাথে একত্র করে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ থেকে ১৯১৬ খ্রিস্টাব্দে (শ্রাবণ, ১৩২৩ বঙ্গাব্দ) ‘হাজার বছরের পুরাণ বাঙ্গালা ভাষায় বৌদ্ধগান ও দোঁহা’ শিরোনামে প্রকাশিত হয়।

পুঁথির নামকরণ নিয়ে পণ্ডিতদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে।

  • চর্যাচর্যবিনিশ্চয়: হরপ্রসাদ শাস্ত্রী আবিষ্কৃত পুঁথিতে এই নামটি পান এবং তাঁর সম্পাদিত গ্রন্থে এই নামটি ব্যবহার করেন।
  • আশ্চর্যচর্যাচয়: মহামহোপাধ্যায় বিধুশেখর শাস্ত্রী পুঁথির সংস্কৃত টীকা বিশ্লেষণ করে এই নামটি প্রস্তাব করেন। তাঁর মতে, নেপালি লিপিকরের ভুলের কারণে ‘আশ্চর্যচর্যাচয়’ শব্দটি ‘চর্যাচর্যবিনিশ্চয়’-এ রূপান্তরিত হয়েছে।
  • চর্যাগীতিকোষ: আধুনিক গবেষকগণ তিব্বতি অনুবাদ থেকে অনুমান করেন যে মূল পুঁথিটির নাম ছিল ‘চর্যাগীতিকোষ’ এবং হরপ্রসাদ শাস্ত্রী আবিষ্কৃত পুঁথিটি ছিল সেই মূল গ্রন্থ থেকে নির্বাচিত পদের সংকলন, যার সংস্কৃত টীকাটির নাম ‘চর্যাচর্যবিনিশ্চয়’। অধ্যাপক অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় সহ অনেকেই এই মত গ্রহণ করেছেন।

রচনাকাল

চর্যাপদের রচনাকাল নিয়ে গবেষকদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য মতপার্থক্য বিদ্যমান:

  • সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় ও প্রবোধচন্দ্র বাগচী: তাঁদের মতে, পদগুলি খ্রিস্টীয় দশম থেকে দ্বাদশ শতাব্দীর মধ্যে রচিত হয়েছিল।
  • ডঃ মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ও রাহুল সাংকৃত্যায়ন: তাঁরা এই সময়কালকে আরও পিছিয়ে নিয়ে চর্যার রচনাকাল অষ্টম থেকে দ্বাদশ শতাব্দী বলে মত প্রকাশ করেছেন।

অন্যান্য প্রমাণের ভিত্তিতে বলা যায়, সিদ্ধাচার্য লুইপাদ দশম শতাব্দীর শেষভাগে বর্তমান ছিলেন এবং কাহ্নপাদকে দ্বাদশ শতাব্দীর মানুষ বলে মনে করা হয়। এই সকল তথ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে দশম থেকে দ্বাদশ শতাব্দীকেই চর্যার পদ রচনার সময়কাল হিসেবে অনুমান করা হয়। তবে এর পরেও প্রায় দুই-তিনশো বছর ধরে গোপনে চর্যাগীতি রচিত হয়েছিল, যার প্রমাণস্বরূপ শশিভূষণ দাশগুপ্ত কর্তৃক সংগৃহীত এবং ১৯৮৯ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ‘নব চর্যাপদ’ নামে প্রকাশিত শতাধিক পদ।

রচয়িতা: সিদ্ধাচার্যগণ

চর্যাপদের রচয়িতারা ‘সিদ্ধাচার্য’ নামে পরিচিত। তিব্বতি ও ভারতীয় কিংবদন্তিতে এঁরাই ‘চৌরাশি সিদ্ধা’ নামে পরিচিত। এঁরা মূলত বজ্রযানী ও সহজযানী আচার্য ছিলেন। আবিষ্কৃত পুঁথিতে মোট ২৪ জন সিদ্ধাচার্যের নাম পাওয়া যায়। এঁরা পূর্ব ভারত ও নেপালের বিভিন্ন অঞ্চলের (যেমন—পূর্ববঙ্গ, উত্তরবঙ্গ, রাঢ়, বিহার, উড়িষ্যা, আসাম) অধিবাসী ছিলেন এবং ব্রাহ্মণ, কায়স্থ, ক্ষত্রিয়, বণিক এমনকি অন্ত্যজ শ্রেণি থেকেও এসেছিলেন।

প্রধান পদকর্তা ও তাঁদের পদসংখ্যা:

পদকর্তাপরিচিতিপদ সংখ্যা
কাহ্নপাদকৃষ্ণাচার্য বা কৃষ্ণপাদ নামেও পরিচিত। পুঁথিতে সর্বাধিক সংখ্যক পদের রচয়িতা।১৩টি
ভুসুকুপাদবাঙালি ছিলেন বলে অনুমান করা হয়।৮টি
লুইপাদআদি সিদ্ধাচার্য হিসেবে পরিচিত। চর্যার টীকাকার মুনিদত্ত তাঁকে এই মর্যাদা দিয়েছেন।২টি (পদ ১ ও ২৯)
সরহপাদ৪টি
কুক্কুরীপাদ৩টি
শান্তিপাদ২টি
শবরপাদ২টি

অন্যান্য পদকর্তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন বিরুআ, গুণ্ডরী, চাটিল, ডোম্বীপা, মহীধর, বীণাপাদ, আর্যদেব, ঢেণ্ঢণ, দারিক, ভাদে, তাড়ক প্রমুখ, যাঁরা একটি করে পদ রচনা করেছেন।

ভাষা: সন্ধ্যাভাষা

চর্যাপদের ভাষা অস্পষ্ট ও হেঁয়ালিপূর্ণ, যার কারণে পণ্ডিতগণ একে ‘সন্ধ্যাভাষা’ বা ‘আলো-আঁধারি ভাষা’ বলে অভিহিত করেছেন। এর কারণ হলো, পদগুলির একটি বাহ্যিক বা আক্ষরিক অর্থ এবং একটি গভীর, গূঢ় বা আধ্যাত্মিক অর্থ রয়েছে। সহজিয়া সাধনার গোপনীয়তা রক্ষার জন্যই সিদ্ধাচার্যরা এই প্রতীকী ভাষা ব্যবহার করতেন।

ভাষাতাত্ত্বিকভাবে, চর্যার ভাষা অবিমিশ্র বাংলা নয়। এর রচয়িতারা বাংলা, বিহার, উড়িষ্যা ও আসামের বিভিন্ন অঞ্চলের হওয়ায় ভাষায় এই সব অঞ্চলের প্রভাবও লক্ষ্য করা যায়। তবে সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় তাঁর “The Origin and Development of the Bengali Language” গ্রন্থে অকাট্য প্রমাণের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠা করেছেন যে চর্যাপদের ভিত্তি মূলত প্রাচীন বাংলা। ‘বঙ্গাল দেশ’, ‘পঁউয়া খাল’ (পদ্মানদী), ‘বাঙ্গালী ভইলি’ ইত্যাদি পদের উল্লেখ বাঙালির দাবিকে জোরালো করে।

ধর্মীয় দর্শন

চর্যাপদের মূল উপজীব্য হলো সহজযান বৌদ্ধ দর্শন। সিদ্ধাচার্যরা মূলত সাধক ছিলেন এবং তাঁদের সাধনার মূল লক্ষ্য ছিল ‘মহাসুখ’ লাভ করা।

  • সাধনপদ্ধতি: মায়াপ্রপঞ্চ ও দ্বৈতবোধের ঊর্ধ্বে উঠে ‘বোধিচিত্ত’কে ‘মহাসুখকমল’-এ স্থির করাই ছিল তাঁদের সাধনার লক্ষ্য। এই মহাসুখ লাভ করলে সাধক মায়াময় জগৎ সম্পর্কে জ্ঞানরহিত হন।
  • দেহকেন্দ্রিক সাধনা: তাঁরা মানবদেহকে অবলম্বন করে সাধনা করতেন। মানবদেহে অবস্থিত চারটি প্রধান চক্রের (নির্মাণ চক্র, ধর্ম চক্র, সম্ভোগ চক্র, সহজ চক্র) কথা বলা হয়েছে।
  • সাংকেতিক শব্দ: তাঁদের দর্শন ও সাধনপদ্ধতি বিভিন্ন রূপকের মাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছে। যেমন:
    • নিঃশ্বাস-প্রশ্বাস: চন্দ্র
    • চিত্ত: হরিণ
    • জ্ঞানমুদ্রা: হরিণী
    • মহাসুখকায়: নৌকা
    • দেবী নৈরাত্মা: শবরী

সাহিত্যমূল্য

ধর্মীয় সঙ্গীত হওয়া সত্ত্বেও চর্যাপদ উন্নত সাহিত্যগুণে সমৃদ্ধ। তৎকালীন সমাজ ও প্রকৃতি থেকে গৃহীত রূপক ও উপমাগুলো পদগুলিকে একটি সর্বাঙ্গসুন্দর কাব্যচিত্রের রূপ দিয়েছে।

  • রস ও অলঙ্কার: চর্যাপদে প্রধানত শান্তরস প্রাধান্য পেলেও করুণ, হাস্য ও শৃঙ্গার রসেরও উপস্থিতি লক্ষ্যণীয়। যেমন:
    • শৃঙ্গার রস: শবরপাদের ২৮ নং পদে শবর-শবরীর প্রেম এবং ৫০ নং পদে শবর-শবরীর মদ্যপানে মত্ত হওয়ার চিত্র শৃঙ্গার রসের সুন্দর উদাহরণ।
    • করুণ রস: ঢেণ্ঢণপাদের ৩৩ নং পদে দারিদ্র্যক্লিষ্ট জীবনের করুণ চিত্র ফুটে উঠেছে।
    • অলঙ্কার: উপমা, রূপক (যেমন: করুণা নাভী), উৎপ্রেক্ষা (চিত্তগজেন্দ্র), বিরোধাভাস ইত্যাদি অলঙ্কারের সার্থক প্রয়োগ ঘটেছে।
  • প্রহেলিকা: চর্যার কিছু পদে প্রহেলিকা বা হেঁয়ালির ব্যবহার দেখা যায়, যা বাহ্যিকভাবে অর্থহীন মনে হলেও গভীর তাৎপর্য বহন করে। কাহ্নপাদের ১২ নং পদে এর চমৎকার উদাহরণ মেলে।

গীতিধর্মিতা ও সঙ্গীত

চর্যার পদগুলি মূলত গান হিসেবে রচিত হয়েছিল এবং সুর সহযোগে গাওয়া হতো। প্রতিটি পদের শুরুতে রাগ-রাগিণীর নাম উল্লেখ করা হয়েছে, যা এর গীতিধর্মিতার প্রমাণ।

  • ব্যবহৃত প্রধান রাগ: পটমঞ্জরী (সর্বাধিক ১১টি পদে), মল্লারী (৫টি), ভৈরবী (৪টি), কামোদ (৪টি), বরাড়ী (৪টি) ও গুঞ্জরী (৪টি)।
  • এছাড়া গৌড়, দেশাখ, রামকেলী, আশাবরী, মালসী ইত্যাদি রাগেরও উল্লেখ পাওয়া যায়।
  • পদগুলিতে ‘ধ্রু’ শব্দের ব্যবহার ধ্রুবপদ বা ধুয়া’র ইঙ্গিত দেয়, যা বারবার গাওয়ার রীতি ছিল।

তৎকালীন সমাজচিত্র

বিশুদ্ধ সাহিত্য সৃষ্টির উদ্দেশ্যে রচিত না হলেও, চর্যাপদে ব্যবহৃত উপমা ও রূপকগুলি হাজার বছর পূর্বের বাংলার সমাজজীবনের এক বিশ্বস্ত দলিল।

  • সামাজিক কাঠামো: সমাজে বর্ণভেদ প্রথা স্পষ্ট ছিল। ডোম, শবর, চণ্ডালের মতো নিম্নবর্গের মানুষেরা নগরের বাইরে, পাহাড়ের ঢালে বাস করত এবং উচ্চবর্ণের দ্বারা অস্পৃশ্য বিবেচিত হতো। (“নগর বাহিরি ডোম্বি তোহারি কুড়িয়া।/ছোই ছোই যাই সো ব্রাহ্মণ নাড়িয়া।।”)
  • অর্থনীতি ও পেশা: তাঁত বোনা, চাঙ্গারি তৈরি, পশুপালন ও শিকার, মাছ ধরা, নৌকা চালানো এবং মদ তৈরি ছিল সাধারণ মানুষের প্রধান জীবিকা।
  • দৈনন্দিন জীবন: ভাত ছিল প্রধান খাদ্য। মাছ, মাংস এবং উৎসব-অনুষ্ঠানে মদ্যপানের প্রচলন ছিল। আয়না, তালা-চাবি, কাঁকন ইত্যাদি ব্যবহৃত হতো। সমাজে চোর-ডাকাতের উপদ্রবও ছিল।
  • বিনোদন ও সংস্কৃতি: নৃত্য, গীত, বাদ্য ও নাটকের প্রচলন ছিল। বীণা, পটহ, ডমরু, বাঁশি ইত্যাদি বাদ্যযন্ত্রের উল্লেখ পাওয়া যায়। দাবা খেলারও উল্লেখ আছে।
  • নারীসমাজ: চর্যার যুগে নারীরা তুলনামূলকভাবে স্বাধীন ছিলেন। তাঁরা পেশা ও সঙ্গী নির্বাচনের অধিকার রাখতেন। নৌকা চালনা, লোক পারাপারের মতো কাজেও নারীদের অংশগ্রহণের উল্লেখ পাওয়া যায়।

প্রবাদ-প্রবচন

চর্যাপদে এমন কিছু পঙক্তি রয়েছে যা প্রবাদের মর্যাদা লাভ করেছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হলো:

প্রবাদপদ সংখ্যাপদকর্তাঅর্থ
আপনা মাংসেঁ হরিণা বৈরীভুসুকুপাদহরিণের মাংসই তার জন্য শত্রু।
হাতের কাঙ্কণ মা লোউ দাপণ৩২সরহপাদহাতের কাঁকন দেখার জন্য দর্পণের প্রয়োজন হয় না।
হাড়ীত ভাত নাহি নিতি আবেশী৩৩ঢেণ্ঢণপাদহাঁড়িতে ভাত নেই, অথচ প্রতিদিন অতিথি আসে।
দুহিল দুধু কি বেন্টেঁ সামায়৩৩ঢেণ্ঢণপাদদোহন করা দুধ কি আবার বাঁটে প্রবেশ করানো যায়?
বর সুন গোহালী কিম দুঠ্‌ঠ বলন্দেঁ৩৯সরহপাদদুষ্ট গরুর চেয়ে শূন্য গোয়াল ভালো।
আন চাহন্তেঁ আন বিনধা৪৪কঙ্কণপাদঅন্য চাহিতে, অন্য বিনষ্ট।

ভাষাতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য

প্রাচীন বাংলার ভাষাতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য নিরূপণে চর্যাপদ একটি অমূল্য উপাদান। এর প্রধান কিছু বৈশিষ্ট্য নিম্নরূপ:

ধ্বনিতত্ত্ব:

  • পদমধ্যে ‘হ’-ধ্বনির সংরক্ষণ (যেমন: খনহ, তিঁহি)।
  • মহাপ্রাণ বর্ণের অস্তিত্ব (যেমন: আক্ষে, কাহ্ন, দিঢ়)।
  • ‘শ’, ‘ষ’, ‘স’ এবং ‘ন’, ‘ণ’-এর যথেচ্ছ ব্যবহার দেখা যায়।
  • পদের আদিতে ‘য’-ধ্বনি ‘জ’-ধ্বনিতে পরিণত হয়েছে (যেমন: জাই < যাই)।
  • স্বরসঙ্গতির উদাহরণ মেলে (যেমন: সসুরা < শ্বশুর)।

রূপতত্ত্ব:

  • বিশেষ্য পদে লিঙ্গভেদ ছিল (যেমন: হরিণ/হরিণী, শবরা/শবরী)।
  • বচনভেদ ছিল এবং সংখ্যাবাচক শব্দ বা দ্বিরুক্ত পদের মাধ্যমে বহুবচন বোঝানো হতো (যেমন: উঁচা উঁচা পাবত)।
  • কারকে বিভক্তির ব্যবহার ছিল। যেমন—কর্তৃকারকে শূন্য বা ‘-এ’, গৌণ কর্মে ‘-ক’, ‘-কে’, অধিকরণে ‘-ই’, ‘-এ’, ‘-হি’, ‘-ত’ ইত্যাদি।
  • অনুসর্গ বা Post position-এর ব্যবহার দেখা যায় (যেমন: ডোম্বী-এর সঙ্গে)।
  • কর্মভাববাচ্যের প্রচুর উদাহরণ রয়েছে (যেমন: ধরণ ন জাই)।
  • যৌগিক ক্রিয়ার ব্যবহার থাকলেও যৌগিক কালের উদাহরণ নেই (যেমন: নিদ গেল)।
  • এমন কিছু বিশিষ্ট প্রয়োগ আছে যা বাংলা ভাষা ভিন্ন অন্য ভাষায় দুর্লভ (যেমন: দুহিল দুধু)।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *